রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি কালি দিয়ে মোছার চেষ্টার ঘটনায় করা মামলায় ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াশ ও মারজিয়া খন্দকার রিমির জামিন আবেদন নাকচ করেছেন আদালত। রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিয়াদ হাসান তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন।
এদিন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আসামিদের কারাগারে রাখার পক্ষে শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি অভিযোগ করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার মাধ্যমে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সামনে দুর্গাপূজা থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আয়াশের বিষয়ে পিপি বলেন, ‘আয়াশ রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কারো মুখে কালি দেয় নাই।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ গালাগালিকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ফ্রান্সের সেফুদার কাছ থেকে গালি শেখার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
শুনানিতে পিপি আরও বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। সেখানে পাকিস্তান প্রসঙ্গ টেনে আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি মোছার চেষ্টার পেছনে উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এর মাধ্যমে সমাজে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিদের জামিন না দিয়ে কারাগারে রাখার আবেদন জানান তিনি।
রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর আবেদন
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল গাফফার হিমেল বুধবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে আয়াশ ও রিমিকে আদালতে হাজির করেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কারাগারে রাখার আবেদন করেন তিনি।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের বিরোধিতা করলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। আয়াশের আইনজীবী মনির হোসাইন সুমনসহ কয়েকজন আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেন। তারা আয়াশের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে জামিনের আবেদন জানান। আদালতে নিজের শারীরিক সমস্যার কথা জানতে চাইলে আয়াশ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার কথা বলেন।
অন্যদিকে রিমির আইনজীবী যুক্তি দেন, দেশের কবিদের গ্রাফিতি না আঁকার প্রতিবাদ থেকেই রিমি সেটি মোছার চেষ্টা করেছেন। তার ছোট শিশু রয়েছে উল্লেখ করে জামিন প্রার্থনা করেন আইনজীবী। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারকারী পুলিশ সদস্যের ভূমিকা যাচাইয়ের দাবিও জানান তিনি।
তবে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা
শুনানি চলাকালে আসামিপক্ষের কয়েকজন আইনজীবীকে জামায়াতের সমর্থক বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটের দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিচারক এজলাস ছেড়ে চলে যান। এ সময় আয়াশ আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা এসব করে আমার জীবন ধ্বংস করবেন?’
পরে বিকেল ৪টা ৪৩ মিনিটে বিচারক আবার এজলাসে ওঠেন। এ সময় উপস্থিত আইনজীবীরা বিচারকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
যে অভিযোগে মামলা
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মোছার চেষ্টার ঘটনায় শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক জিয়াউল হক বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আরও দুই আসামি সাকিবুল হাসান ও সুজন শেখকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। সাকিবুলের তিন দিন এবং সুজনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। মঙ্গলবার রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
মামলার বিবরণ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত শনিবার দুপুরে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মোছার চেষ্টা করেন একদল তরুণ। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে ঘটনাস্থলে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে আয়াশসহ চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
ঘটনাস্থলে এক নারীকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দিতে দেখা যায়। পুলিশ বাধা দিলে ওই নারী ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন বলে দাবি করেন। পরে আয়াশের নেতৃত্বে উপস্থিত ব্যক্তিরা স্লোগান দেন।
এর আগে গত ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ওই এলাকার দেয়ালে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রাফিতি আঁকার উদ্যোগ নেয়। এসব প্রতিকৃতির মধ্যে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
পরবর্তী সময়ে ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এসব সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সত্যজিৎ রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে তাদের ছবি আঁকার যৌক্তিকতা নিয়েও আপত্তি জানানো হয়।
রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি মোছার ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা মামলাটির তদন্ত চলছে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, রিমান্ড শেষে আয়াশ ও রিমিকে এখন কারাগারে থাকতে হবে।

