আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং বিপুল সামরিক সরঞ্জাম থাকার পরও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক হামলায় বিমানবন্দরে প্রাণহানির ঘটনা এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা সামরিক অভিযান চালালে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও ভাবিয়ে তুলছে রিয়াদকে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় তুলনামূলক দুর্বল সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হুতিরা বর্তমানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তার জন্যও গোষ্ঠীটি হুমকি তৈরি করছে। এর ফলে আরব উপদ্বীপে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি আরব। অন্যদিকে, দেশটির সরকারবিরোধী হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এই বিরোধের জেরেই সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলার পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজে যাত্রীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। বিমানবন্দরের একটি অংশ ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়ার দৃশ্যও উঠে এসেছে ফুটেজে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের ঘরে থেকে কাজ করার মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপুল অস্ত্র থাকলেও কেন হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব?
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট অস্ত্র রপ্তানির ১২ শতাংশ পেয়েছে দেশটি।
বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উন্নত রাডার এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে রিয়াদ। ২০২৬ সালের বাজেটে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৯০০ কোটি ডলারে ৭৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তিও করেছে সৌদি আরব।
তবে আধুনিক অস্ত্র ও বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট থাকলেই সব ধরনের হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয় না। সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তেল উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনা। এসব স্থাপনার সবগুলোকে একই সঙ্গে সুরক্ষা দেওয়া দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এর ওপর ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের সীমান্ত প্রায় ১ হাজার ২৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ। সীমান্তের বড় অংশ দুর্গম মরুভূমির মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হওয়ায় নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সৌদি বিশ্লেষক আলি শিহাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সৌদি আরবের মতো বিশাল ভূখণ্ডের দিকে নিক্ষেপ করা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অস্ত্রের মজুত। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, দেশটির প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিত্র দেশগুলোর কাছেও সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।
সম্প্রতি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে সৌদি আরব। তবে হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান পরিস্থিতিতে এই দুই দেশের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে পারলে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা সম্ভব। ফলে সৌদি আরবের জন্য শুধু নতুন অস্ত্র সংগ্রহ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের অসম যুদ্ধে এগিয়ে হুতিরা?
লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে অসম যুদ্ধকৌশলে দক্ষতা অর্জন করেছে হুতিরা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিজ্ঞতা তাদের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এসব অভিযানের মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের রাডার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে গোষ্ঠীটি।
অসম যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটি পক্ষের অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল অস্ত্রের বিপরীতে অন্য পক্ষ তুলনামূলক কম ব্যয়ের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। ফলে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষাকারীকে অনেক সময় ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের হামলা চলতে থাকলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপের সময় হুতিদের সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। ২০২৪ সাল নাগাদ তা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছায়। হুতি ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশল এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পাল্টা হামলার পথে যাবে কি রিয়াদ?
হুতিদের হামলা প্রতিহত করার পাশাপাশি কীভাবে জবাব দেওয়া হবে, তা নিয়েও সিদ্ধান্তের মুখে রয়েছে সৌদি আরব। দেশটির সামনে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপ, অন্যদিকে সামরিক পাল্টা পদক্ষেপের ফলে সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি।
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বেসামরিক স্থাপনা, বিশেষ করে বিমানবন্দরে হুতিদের হামলাকে যুদ্ধের কৌশলে বড় পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এসব হামলার জবাব দিতে সৌদি আরব বিমান হামলা এবং স্থানীয় মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তবে এমন পদক্ষেপ যাতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ না নেয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমির মতে, সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে হুতিরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবের বড় ধরনের পাল্টা আঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার সংঘাত এখন শুধু সীমান্তকেন্দ্রিক নিরাপত্তা সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই। তেল উৎপাদন, বিমান চলাচল, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তার সঙ্গেও বিষয়টি জড়িয়ে পড়েছে।
সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, একদিকে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিরোধ করা, অন্যদিকে এমন সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে চলা, যা ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে তুলতে পারে। বিপুল অস্ত্রভান্ডার ও আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘস্থায়ী এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হুমকি মোকাবিলায় শুধু সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়—এ পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাই সামনে আনছে।
এখন রিয়াদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কীভাবে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা যায় এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলের সমন্বয়ে সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো যায়।
সূত্র: রয়টার্স, এনবিসি নিউজ, সিএনএন

