সীতাকুণ্ডে ঘুষ না দেয়ায় নামজারি আবেদন বাতিলের অভিযোগ

ইশতিয়াক আহমেদ মেহরাজঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় নামজারি (মিউটেশন) আবেদন খারিজ করে দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নারী নাহিদা আক্তার প্রতিকার চেয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী অফিসাররের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

- Advertisement -

অভিযোগ আছে, জমির নামজারি আবেদনের প্রস্তাব করতে উপজেলা ভূমি অফিসে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অস্থায়ী কর্মচারী মোঃ কামরুল ইসলাম। পরে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে নামজারি আবেদন ফাইলটি উপজেলা ভূমি অফিসে পাঠানো হলে প্রধান অফিস সহকারী (নাজির) সাহেদ ইসলাম এসিল্যান্ডের কথা বলে জমি নামজারি বাবদ পুনরায় ঘুষ দাবি করেন। হতদরিদ্র নাহিদা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমির কাগজপত্রে কৃত্রিম ত্রুটি সৃষ্টি করে নামজারির আবেদনটি খারিজ করে দেয়া হয়।

ভুক্তভোগী নারী নাহিদা আক্তারের অভিযোগ, তার বাবা মরহুম আবু তাহেরের পিতা রোশন আলী সীতাকুণ্ড উপজেলার সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ মৌজার বিএস খতিয়ান নং ৪৬৭ দাগ নং ১৫৮০ এর ০.০০২৫ একর জমির সমস্ত কাগজপত্র রেকর্ড অনুযায়ী মালিক হন। যার আরএস খতিয়ান নং ৬৫০ ও পিএস খতিয়ান নং ১২৮২। সেই অনুযায়ী তিনি তথা রোশন আলীর ওয়ারিশগন জমিটির প্রকৃত মালিক হন। নিয়মানুযায়ী তিনি সীতাকুণ্ড সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারি (মিউটেশন) আবেদন করতে গেলে সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অস্থায়ী কর্মচারী কামরুল ইসলাম ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। কারণ জানতে চাইলে ওই অফিসের কর্মকর্তারা টাকা ছাড়া ফাইল যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন নাহিদাকে। পরে নাহিদা আক্তার বাধ্য হয়ে ৩০ হাজার টাকা প্রদান করে নামজারি আবেদনটি এসিল্যান্ড অফিসে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা হলে নামজারি অনুমোদন করতে তার কাছে পুনরায় ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন উপজেলা ভূমি অফিসের প্রধান অফিস সহকারী (নাজির) সাহেদ ইসলাম। এসময় কেনো টাকা দিতে হবে জানতে চাইলে এসিল্যান্ড টাকা ছাড়া কোন কাজই করেন না বলে জানান নাজির সাহেদ ইসলাম। শুধু তাই নয় ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় আজকাল করে বারবার কালক্ষেপণ করে তাকে হয়রানি করেন নাজির সাহেদ ইসলাম।

নাহিদা অভিযোগে বলেন, নামজারি করতে তিনি এসিল্যান্ডের সাথে সরাসরি দেখা করতে চাইলেও ভূমি অফিসের কর্মচারীরা তাকে দেখা করতে দেননি। এসিল্যান্ড টাকা না পাইলে কারো সাথে দেখা করবেনা বলেও সাফ জানিয়ে দেন তারা (কর্মচারীরা)।

জেলা প্রশাসককে দেয়া অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, নিয়মানুযায়ী নামজারী করতে হলে শুনানি কালে মূল দলিল প্রদর্শন করতে দেয়ার কথা। কিন্তুু ঘুষ না দেয়ায় তাকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি। কোন প্রকার নোটিশ বা শুনানি ছাড়াই নামজারির আবেদনটি বাতিল করে দেয়া হয়েছে। সকল কাগজপত্র দাখিলের পরও অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তাদের কারসাজিতে ভূমির প্রকৃত মালিক হয়েও তিনি নামজারি অনুমোদন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

এ বিষয়ে নাহিদা আক্তার বলেন, নামজারি আবেদন ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে এসিল্যান্ড অফিসে আনতেই ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। কি করব তারা তো টাকা ছাড়া নাকি ফাইল ছাড়ে না। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারী কামরুল ইসলাম বলেছিলেন ৩০ হাজার টাকার ঘুষের মধ্যে সবকিছু করে দিবে। কিন্তুু পরে উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারীরা আবারও টাকা দাবি করলে সেটি কামরুলকে জানানো হয়। এরপর কামরুল তার কাজ শেষ, বাকি কাজ এসিল্যান্ড অফিসে ঘুস দিয়ে করতে হবে বলে জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

নাহিদা আক্তার আরও বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বহু কষ্টে এ টাকা দিয়েছি। তবুও আমার কাজ হয়নি। আমি একজন এতিম। আমার হক মেরে খেয়েছে তারা। দীর্ঘ ৬ মাস এ অফিস, ও অফিস করে ঘুরেছি। কোন কাজ হয়নি। উপজেলা এসিল্যান্ড অফিসে যতবার গিয়েছি ততবার অনুমোদন নিতে আবারও টাকা দাবি করেছে কর্মচারীরা। একবার নাজির সাহেদ ইসলাম টাকা দাবি করে, আরেকবার অন্যজন দাবি করে।টাকা না দেয়ায় আমাদেরকে শুনানির জন্য ডাকাও হয়নি। মূল দলিল প্রদর্শন করতেও বলা হয়নি। তারা বলছে আমরা নাকি মূল দলিল প্রদর্শন করিনি। জমির সকল খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলাসহ সকল কাগজপত্র আমাদের নামে আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা শুধু আমাদের নামে খতিয়ান সৃজন করতে আবেদন করেছিলাম। কিন্তুু কোন কারণ ছাড়াই, শুনানি না করেই আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছে এসিল্যান্ড।আগষ্ট মাসে উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা হলে আবেদনটি খারিজ করে দেয়া বলে জানান কম্পিউটার অপারেটররা।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোঃ শাহ আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি ছিলাম না৷ আমি এবিষয়ে কিচ্ছু জানিনা। আবেদনটি পাঠিয়েছেন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফয়জুল ইসলাম৷ ৩০ হাজার টাকা ঘুষ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এসব বিষয়ে অবগত নয়। এমনকি কামরুল ইসলাম নামে কেউ তার দপ্তরে কাজ করেন না বলেও জানান তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুন্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, নামজারি আবেদনটি আমার কাছে আসেইনি। আমি জানিনা। তবে সংশ্লিষ্ট তহশীলদার প্রতিবেদন দিয়েছেন মূল দলিল প্রদর্শন না করার কারণে আবেদনটি খারিজ করা যেতে পারে। এটি এখনো খারিজ হয়নি। আবেদনকারীরা কেউ আমার কাছে আসেনি।

প্রসঙ্গত, এর আগে চলতি বছরের ১১ মে সীতাকুণ্ড উপজেলা ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে নামজারি ফাইল গায়েবের অভিযোগ তুলেন জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক সংস্থার বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও সিনেটর ড. মাশফিক আহমেদ চৌধুরী। ওইসময় তিনি ভূমিমন্ত্রী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৬ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শাকিলা রহমান বিষয়টি তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন।

সর্বশেষ