বিএনপির স্থায়ী কমিটির সামনে তিন চ্যালেঞ্জ

দল প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর পূর্ণ করেছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ, আছেন হাসপাতালে আসা-যাওয়ার মধ্যে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত। বিএনপির মূল এই নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে দলের স্থায়ী কমিটিই সামলাচ্ছে সবকিছু। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নীতিনির্ধারণী এই কমিটির সদস্যরাই দলের ভেতরে-বাইরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার (১ সেপ্টেম্বর) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনটিকে সামনে রেখে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে।

- Advertisement -

বিএনপির নীতিনির্ধারক, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলরা মনে করছেন, ৪৪ শেষ করে ৪৫ বছরে পা দেওয়া বিএনপির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সামনে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা, যাদের অধিকাংশ বয়সে প্রবীণ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে— দেশে গণতন্ত্র ফেরানো। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়, ৭৪ এ এসে আবারও একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তা নস্যাৎ হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। দেশের মানুষকে আবারও ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া মূল লক্ষ্য বিএনপির।’

দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, সামনের দিনগুলোতে বিএনপির মোটা দাগে তিনটি চ্যালেঞ্জ। একটি হচ্ছে, নির্বাচনকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা। নির্বাচনে অংশ নিলে বা না নিলে উভয় দিক থেকে রাজনৈতিক সাফল্য আনাই হচ্ছে— বর্তমান স্থায়ী কমিটি ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মূল চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিষ্পন্ন করা। তৃতীয়, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলোর যুগপৎ কর্মসূচি রাজপথে কার্যকর করা।

বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল মনে করেন, দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার ঘাটতির কারণে এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন। সেক্ষেত্রে নেতাদের মধ্যে পরস্পরের আস্থা সৃষ্টি হলেই কেবল চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হওয়া সম্ভব।

দলের সিনিয়র একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিএনপির মূল সংকট তার রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে, তার বিদেশনীতি, তার অর্থনৈতিক কৌশল, তার রাজনৈতিক কৌশল থেকে অনেক দূরে সরে গেছে বিএনপি। এর বড় কারণ দলে জামায়াতপন্থীদের প্রভাব। জামায়াতকে সরিয়ে দেওয়া হলে স্বল্প মেয়াদে ক্ষতি হলেও দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে বিএনপি। বেঁচে থাকতে আমরা হয়তো ফল ভোগ করতে পারবো না, কিন্তু দলের পরবর্তী প্রজন্ম দেশকে সুশাসন দিতে পারবে দলীয়ভাবে।’

বিএনপির মিডিয়া সেল ও চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান মনে করেন, ভোটারবিহীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসন ব্যবস্থায় জনগণের মধ্যে যে নাভিশ্বাস তৈরি হয়েছে, এর থেকে তারা বের হতে চায়। বের হওয়ার রাস্তা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির কাছেই। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বিএনপি সময়ের দাবি পূর্ণ করবে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার শপথ হবে বিএনপি’র ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী’তে।’

দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা জানাচ্ছেন, আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলকে সুসংগঠিত করে বিরোধী দলগুলোকে মাঠে নামানো হচ্ছে বর্তমান নেতাদের মূল চ্যালেঞ্জ। বিগত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক কোনও ফলাফল আনতে না পারায় বর্তমান নেতাদের এটাই শেষ চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অনেকে।

দলের দুজন প্রভাবশালী ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, এবার ফলাফল ইতিবাচক না হলে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের অধিকাংশকেই সরে দাঁড়াতে হতে পারে। ব্যর্থতার দায় মেনে নিয়ে তারা দলে সক্রিয় হতে পারবেন না, এমন সতর্কবার্তাও রাখছেন অনেকে।

একজন প্রভাবশালী দায়িত্বশীল বলেন, ‘বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে নেতৃত্ব দিয়ে যুগপৎভাবে রাজপথে সক্রিয় হতে বিরোধী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে তিনি কীর্তিমান হতে পারবেন না।’

স্থায়ী কমিটির নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অবশ্য তা মনে করেন না। তার ভাষ্য, যে দেশে গণতন্ত্র থাকে না, সেখানে জয়-পরাজয় মুখ্য নয়। তিনি বলেন, ‘মানুষের ভোটে তো বিএনপি হারেনি। সরকার, আমলা, প্রশাসন যুক্তভাবে ভোটের অধিকার হরণ করেছে।’

দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য উল্লেখ করেন, এবার কোনোভাবেই ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। জীবন গেলেও বিএনপি নেতারা নির্বাচনে যাবেন না।’

দলের ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শামসুদ্দিন দিদার জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শেরেবাংলা নগরের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন দলের নেতাকর্মীরা। এ উপলক্ষে মাজার প্রাঙ্গণে কোরআন খতম, ফাতেহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাত করা হবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা, দলের সিনিয়র নেতারা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা এ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। ক্রমান্বয়ে আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি।

এছাড়া, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর রাতে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে শুভেচ্ছা-বিনিময় করতে পারেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ১৯ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ন্যায়বিচার-ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিএনপি গঠন করেন।

দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিশেষ বানী দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বানীতে মির্জা ফখরুল নেতাকর্মীদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানান।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি দেশ ও মানুষের উন্নয়ন এবং বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে গভীরভাবে বিশ্বাস করে। বিএনপি’র ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মহান দিনে দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের গতিশীল কার্যক্রম এবং নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করার দৃষ্টান্ত এক অনন্য প্রেরণার সৃষ্টি করেছে। এই ঘোর দুর্দিনে জনগণকে সংগঠিত করার কোন বিকল্প নেই।’

মির্জা ফখরুল উল্লেখ করেন, ‘সরকার যেখানে জনগণের প্রতিপক্ষ সেখানে মানুষের জানমালের কোন নিরাপত্তা থাকতে পারে না। এই সরকার হরণের খেলায় মেতে উঠেছে। সুতরাং গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতেই হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ্বং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে হয়রানির খড়গ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রায় পৌণে পাঁচ বছর বন্দী জীবন-যাপন করছে। কারণ তিনিই গণতন্ত্রের প্রতীক এবং জনগণের নাগরিক ও বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে প্রধান কন্ঠস্বর।’

‘দেশের বর্তমান এই ক্রান্তিকালে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থেকে অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। বিএনপি’র ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমি দেশবাসীকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য উদাত্ত আহবান জানাই।”বলেন বিএনপির মহাসচিব।

সর্বশেষ