বাংলাদেশের রেলপথ অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের আওতায় রেলওয়ের আয়বৃদ্ধির জন্য পাঁচটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিসই হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত রেলওয়ের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। এতে বাড়বে সরকারের রাজস্ব আয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখার মাধ্যমে জনসাধারণের রেল পরিষেবাও বাড়বে।
এছাড়া বাড়বে রেলওয়ের অপারেশনাল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের গতিশীলতা।
দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার রেললাইন আছে। এর মধ্যে তিন দফায় আড়াই হাজার কিলোমিটার রেললাইনের পাশে অপটিক্যাল ফাইবার কেব্ল বসানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার ফাইবার স্থাপন করা হয়। সেকেন্ডারি লাইন হিসেবে থাকা রেলওয়ের বাকি ৫৭৫ কিলোমিটারের রুটগুলোকে এ নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়নি। এবার এখানেও কেব্ল বসানোর কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।
মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) রেল ভবনে বাংলাদেশ রেলওয়ে পাঁচ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিসই এর আয়োজন করে। এর মধ্যে কোম্পানিগুলো হলো লাইসেন্সধারী বাহন লিমিটেড, সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড ও মোবাইল অপরেটর বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন, মোবাইল অপরেটর রবি ও ফাইবার লিমিটেড।
রেলওয়ের পক্ষে সকল ক্ষেত্রে চুক্তিপত্রে সই করেন চিফ সিগনাল ও টেলিকম কর্মকর্তা বেনুরঞ্জন সরকার। বাহন লিমিটেডের পক্ষে সই করেন সাঈদ সামিউল হক, এম ডি বাহন লিমিটেড। সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পক্ষে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আলি মুর্তজা খান।
বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনের পক্ষে এরিক আস এমডি ও চীফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। রবির পক্ষে চিফ টেকনিক্যাল অফিসার পেরিহেম এলহামি। ফাইবার লিমিটেডের পক্ষে চীফ মার্কেটিং অফিসার রাজীব আহমেদ সুলতান চুক্তিপত্রে সই করেন।
জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী ৩ হাজার ২০৫.৬ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার বেজড টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক রয়েছে রেলওয়ের। এই অপটিক্যাল ফাইবারের অবহিত অংশ তিনটি এনটিটিএন লাইসেন্সধারী কোম্পানি এবং দুটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির কাছে পাঁচ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হচ্ছে।
সেই হিসাবে বাহন লিমিটেড ২৫টি সেকশনে মোট ১ হাজার ৬৮৩.৯৩ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করবে। সেখান থেকে পাঁচ বছরের আয় হবে ৮১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড ১৩টি সেকশনে মোট ৮৯৫.২১ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করবে। সেখান থেকে পাঁচ বছরের আয় হবে ৪৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন লিমিটেড ৮টি সেকশনে মোট পাঁচ ৫৯৫.৩৯ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করবে। সেখান থেকে পাঁচ বছরে আয় হবে ২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। রবি আজিয়াটা লিমিটেড পাঁচটি সেকশনে মোট ২৮০.৪৮ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করবে। সেখান থেকে পাঁচ বছরে আয় হবে ১৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেড তিনটি সেকশনে ১৭৭.৮১ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করবে। সেখান থেকে পাঁচ বছরে আয় হবে ৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, বিদেশিরা যেভাবে রেল থেকে আয় করে থাকে, বাংলাদেশ রেলওয়েও বহুমুখী আয়ের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। রেলের অপটিক্যাল ফাইবার লিজ প্রদান রেলের আয়বৃদ্ধি কার্যক্রমের একটি অংশ বলে জানান রেলপথমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, রেল জনগণের বাহন। জনগণকে জানানোর উদ্দেশ্যে, স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য আমরা প্রকাশ্যে চুক্তি করছি। তিনি বলেন, রেলওয়ে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এটি ভর্তুকি দিয়ে চলছে। রেলের অনেক সম্পদ আছে। আমরা সেখান থেকে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
মন্ত্রী আরো বলেন, একটি দেশের ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য টেকসই উন্নয়নের জন্য রেল খাতের উন্নয়ন জরুরি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আলাদা মন্ত্রণালয় করে দেওয়ার পরে আমরা সেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
তিনি জানান ’৪৭-পরবর্তী সময়ে রেলওয়ের কোনো উন্নয়ন হয়নি। স্বাধীনতার সময় রেলখাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু রেলকে পুনর্গঠন করেন। ’৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো রেলের কোনো উন্নয়ন করেনি। ১০ হাজার রেলের কর্মকর্তা কর্মচারীকে হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে বিদায় করেছে। আমরা ভবিষ্যতে রেলের জমিসহ পণ্য পরিবহনের ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করছি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের দৈনন্দিন ট্রেন পরিচালনায় টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুটি স্টেশনের মধ্যে লাইন ক্লিয়ার আদান-প্রদানে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়।
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৮৪ সালে রেলে অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯৯০ সালে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করা হলেও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে অদ্যাবধি ৩ হাজার ২০৫ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করা হয়েছে।
চুক্তিসই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবীর।
এ সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদারসহ রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
রেলওয়ে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ১৯৯২ সালে নরওয়ে সরকারের অনুদানে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক একটি সমন্বিত টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এই নেটওয়ার্কে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার কম্পোজিট কেব্ল (অপটিক্যাল ফাইবার+ কপার কেব্ল) ও ২০০ কিলোমিটার শুধু কপার কেব্ল স্থাপন করা হয়।
রেলওয়ের ব্যবহারের অতিরিক্ত অপটিক্যাল ফাইবারের সুপ্ত ধারণক্ষমতা ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে গ্রামীণফোন লিমিটেডকে লিজ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও গ্রামীণফোন আরো ৪০৯ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করে, যা বর্তমানে গ্রামীণফোন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে আসছে।
সমপ্রতি রেলওয়ে আরো ৪০০ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করেছে, যা থেকে রেলওয়ের ব্যবহারের অতিরিক্ত অপটিক্যাল ফাইবার কোর টিটিআরসি কর্তৃক এনটিটিএন লাইসেন্স প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য এনটিটিএন, টেলিকম অপারেটর, আইএসপি অপারেটরের মধ্যে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে লিজ প্রদানের বিষয়টি শেষ করা হয়েছে।
এছাড়াও রেলওয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বর্তমানে প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার নতুনভাবে স্থাপন করা হচ্ছে।