নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ (তিতাস-২৮) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। এ কূপ থেকে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। দুপুরে কূপটির গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এ সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, জ্বালানি সচিব জিয়াউল হক এবং বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে দেশীয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের বাড়তি ব্যয় বহন করা কঠিন। এ কারণে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির ধারাবাহিক উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তিতাস-২৮ কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় শিল্প-কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে গতি আসবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। এদিকে তিতাস-২৯, তিতাস-৩০ ও তিতাস-৩১ নম্বর কূপ খননের কাজও চলমান রয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, জ্বালানি খাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি সক্ষমতা সম্প্রসারণেও কাজ করছে সরকার। বিভিন্ন উৎস থেকে দৈনিক ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আরও ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে দৈনিক ৩ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ সম্ভাব্য দৈনিক ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তিতাস-২৮ কূপের উৎপাদন শুরু হওয়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী ১০ বছরের জন্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর তথ্যমতে, এরই মধ্যে স্বল্পতম সময়ে ৩১টি কূপ খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আরও সাতটি কূপ খননের কাজ চলমান রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫০টি কূপ খনন সম্পন্ন হলে সেগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭৬২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। এ ছাড়া বর্তমানে চালু থাকা দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি পরিকল্পিত আরও দুটি এফএসআরইউর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করার উদ্যোগ রয়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজনিত সংকট শুরুর আগে দৈনিক ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। কিন্তু সংকটের প্রভাবে সরবরাহ কমে ২ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। তবে সরকারের জরুরি উদ্যোগের ফলে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তিনি জানান, দেশের অভ্যন্তরে ও সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। বিজিএফসিএল সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস-২৯, তিতাস-৩০, তিতাস-৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপ খননের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব কূপের খননকাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। এর ফলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক অতিরিক্ত সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ শুরু হয়। পরে ১৯ জুন থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কূপটি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। পরীক্ষামূলক সরবরাহের সময় কূপটি থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। কূপটির গভীরতা ৩ হাজার ৬০১ মিটার বা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। এটি খননে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।




