চট্টগ্রামে সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও পরীক্ষাগার উদ্বোধন, জেলা-উপজেলা পর্যায়েও বাড়বে তদন্ত সক্ষমতা

মো.মোক্তার হোসেন বাবু, চট্টগ্রাম:
spot_img

মো.মোক্তার হোসেন বাবু, চট্টগ্রাম:সাইবার অপরাধ, অনলাইন আর্থিক জালিয়াতি ও ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় দেশের আটটি বিভাগীয় সদরে দ্রুত ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগার স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত পুলিশের প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, পরিচয় জালিয়াতি, অনলাইন ব্ল্যাকমেল এবং ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মতো অপরাধের তদন্তে এসব পরীক্ষাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।

- Advertisement -

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ শনাক্ত ও দমনে আধুনিক সরঞ্জাম, দক্ষ জনবল এবং ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ লাইন্সের দামপাড়ায় সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আট বিভাগে পরীক্ষাগার, জেলা-উপজেলায় সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রথম পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগীয় সদর দপ্তরে ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের সরকারের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ৮টা বিভাগীয় সদর দপ্তরে আমরা খুব দ্রুত এই ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করব। আমরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছি। কোরীয় সরকারের সহযোগিতা আজকেও আমরা চেয়েছি আমাদের এই ফরেনসিক ল্যাবগুলো প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে।’

নতুন পরীক্ষাগারগুলো স্থাপনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের তদন্ত সক্ষমতা বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং প্রশিক্ষিত জনবল প্রস্তুত করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রামের নতুন পরীক্ষাগারটি অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। তবে ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকবে।

প্রযুক্তির আড়ালে অপরাধ, তদন্তে বাড়ছে জটিলতা

ইন্টারনেট ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে অপরাধের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, নকল ওয়েবসাইট তৈরি, অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা, ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেলের মতো অপরাধের মুখোমুখি হচ্ছে মানুষ।

অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ই-কমার্সের প্রসার অপরাধীদের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। একাধিক অ্যাকাউন্ট ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তর, ভিন্ন দেশে অবস্থান করে অপরাধ সংঘটন এবং ডিজিটাল আলামত মুছে ফেলা বা পরিবর্তনের কারণে অপরাধী শনাক্ত করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে।

এসব অপরাধের তদন্তে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ডিজিটাল স্টোরেজ, অনলাইন যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের মাধ্যমে এসব উপাত্ত পরীক্ষা করে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ঘটনার ধারাবাহিকতা ও সম্ভাব্য আলামত শনাক্ত করা সম্ভব। তবে সংগৃহীত তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং আইনসম্মতভাবে আলামত সংরক্ষণও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণা থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারে কারসাজির মতো অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের বিকল্প নেই।

গত ১ অক্টোবর থেকে সাইবার পুলিশ ইউনিটের কার্যক্রম

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের জন্য পৃথক সাইবার ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর থেকে ইউনিটটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে এটি পরিচালিত হচ্ছে।

এই ইউনিটের নেতৃত্বে সাইবার অপরাধ তদন্তে কেন্দ্রীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ডিজিটাল প্রতারণা, অনলাইন হয়রানি, পরিচয় জালিয়াতি ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরীক্ষাগারের আধুনিক সরঞ্জাম সচল রাখা, পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সংগৃহীত ডিজিটাল আলামত দ্রুত বিশ্লেষণের সক্ষমতার ওপর।

৫৯ কোটি টাকার প্রকল্পে কোরিয়ার সহযোগিতা

বাংলাদেশ পুলিশের ডিজিটাল তদন্ত ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় জাতীয় ও আঞ্চলিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ সাইবার পরিসর’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কোরীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (কোইকা) প্রকল্পটিতে সহায়তা দিচ্ছে।

২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। একই বছরের ১৫ মে জারি করা হয় প্রশাসনিক আদেশ। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।

প্রকল্পের আওতায় ১০ তলা ভবনের ভিত্তির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি সিআইডি সদর দপ্তরে সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।

সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য ইতোমধ্যে তিনটি দেশীয় ও আটটি বিদেশি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সিআইডির পরীক্ষাগার সম্প্রসারণের প্রয়োজন

সিআইডি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই রাসায়নিক পরীক্ষাগার পরিচালিত হয়ে আসছে। সেখানে বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা ও প্রতিবেদন তৈরির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, মানুষের দ্রুত বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট সনদ প্রয়োজন হয়। পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে তদন্তের প্রয়োজনে এসব প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।

ফৌজদারি মামলায় ডিজিটাল প্রমাণের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, আলামতের অখণ্ডতা এবং বিশ্লেষণের যথার্থতা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে আদালতে উপস্থাপন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

অপরাধ দমনে বাধা দিলে আইনি ব্যবস্থা

অনুষ্ঠান শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য নাশকতা, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সব বিষয়ে দায়িত্ব আছে, চ্যালেঞ্জ নাই।’

পুলিশের অভিযানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ এবং আসামি গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অপরাধ দমন করতে গিয়ে পুলিশ মাঝেমধ্যে হামলার শিকার হয়, এটি নতুন ঘটনা নয়। অপরাধীদের দমনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ গ্রেপ্তার করতে গেলে কেউ যদি আসামিকে সহায়তা দিয়ে থাকে, সেই ক্ষেত্রেও আমরা যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেব, যদি আপনারা তথ্য দেন। আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ লাইন্সের দামপাড়ায় সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন এবং চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান।

বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। এ ছাড়া পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক সরদার নুরুল আমিন এবং কোইকার বাংলাদেশ কার্যালয়ের পরিচালক জি-হুন কিম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন।

আট বিভাগে ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগার স্থাপন ও মাঠপর্যায়ে তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আরও বিস্তৃত হবে। তবে এর সুফল পেতে পরীক্ষাগার স্থাপনের পাশাপাশি দক্ষ জনবল, দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনসম্মত তদন্তপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

সর্বশেষ