এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, চালের দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং খাদ্যনিরাপত্তা সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির সতর্কতা, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি ফসল উৎপাদনে চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সার ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।

- Advertisement -

আইএমএফের ফিসকাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এর প্রভাবে গত আগস্টে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের শেষ ভাগের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

ভালদেসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে চালের দাম ৫০ শতাংশ, গমের দাম ৩৭ শতাংশ এবং সয়াবিনের দাম ২১ শতাংশ বেড়েছে। আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। এতে আফ্রিকা, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি উৎপাদন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যায়। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি দেখা দিতে পারে। কৃষি উৎপাদন, পানির প্রাপ্যতা ও খাদ্য সরবরাহে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

খাদ্যমূল্য সূচকে ঊর্ধ্বগতি

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্যমূল্য সূচকেও। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সূচকটি জানুয়ারির ১২৪ দশমিক ১ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ১৩৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। মাংস, শস্য, দুগ্ধজাত পণ্য, ভোজ্যতেল ও চিনির আন্তর্জাতিক মূল্য বিবেচনায় এ সূচক তৈরি করা হয়।

খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সারের দামও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এতে কৃষিপণ্যের সরবরাহ ও বাজারদর—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আফ্রিকার দেশগুলো

খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে আফ্রিকা অন্যতম। মহাদেশটির অনেক দেশ খাদ্যের চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে এসব দেশের মানুষের ওপর।

সোমালিয়ার অর্থমন্ত্রী বিহি ইমান এহে বলেন, এল নিনোর প্রভাবে দেশটির কৃষি উৎপাদন ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ খাদ্য, জ্বালানি, নৌপরিবহন এবং সারের বাজারে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরও বলেন, উচ্চ ঋণ, সুদ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে খাদ্যসংকট মোকাবিলা অনেক দেশের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

সোমালিয়ায় খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশটির অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ সোমালীয় এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মতে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে নগদ সহায়তা দেওয়া তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং কার্যকর।

জলবায়ু মোকাবিলায় বাড়তি অর্থায়নের তাগিদ

খাদ্যনিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইএসসিডব্লিউএ) নির্বাহী সচিব রানিয়া আল-মাশাত বলেন, আগামী মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ ৩১-এ জলবায়ু ও খাদ্যব্যবস্থার জন্য অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে।

তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব দেশের বাজেট সীমিত, সেখানে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যসহায়তা ও ভর্তুকির ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আল-মাশাত জানান, সরকারের আর্থিক চাপ কমাতে নতুন ধরনের অর্থায়নব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে এ বিষয়ে অগ্রগতি আশা করছে সংস্থাটি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ সংকট মোকাবিলায় জরুরি খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি কৃষিতে জলবায়ুসহিষ্ণু প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ