আধুনিক যুদ্ধের ধরন ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের প্রচলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশলকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনার কথা বলেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সমরাস্ত্র দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
রোববার সাভার সেনানিবাসে নবম পদাতিক ডিভিশনের অধীন সাতটি রেজিমেন্ট ও ব্যাটালিয়নকে জাতীয় পতাকা বা ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একটি আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবলে সীমাবদ্ধ নয়। শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থাই বাহিনীর প্রকৃত শক্তির ভিত্তি।
সেনাবাহিনীর সদস্যদের সংবিধান, দেশের আইন, সামরিক বিধিবিধান ও মানবিক মূল্যবোধ মেনে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি দেশবাসীর প্রত্যাশা হলো, তারা সব সময় পেশাদারত্ব ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে।
দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ার পরিকল্পনা
সামরিক খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সার্বিক আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সমরাস্ত্র দেশে উৎপাদনের জন্য দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তির উন্নয়নকে মানবসম্পদের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এবং তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে সাইবার হামলা, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের গুরুত্ব বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তিত বাস্তবতায় জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক প্রস্তুতিতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
সেনাসদস্যদের বেতন-ভাতা ও পেনশন
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টিও বক্তব্যে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, জাতীয় পে-স্কেলের আওতায় সেনাসদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ চালুর বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সামরিক সদস্যদের অবসরকালীন আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য
বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার পক্ষে প্রতিরোধ ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ১, ২, ৩, ৪ ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাংলাভাষী সেনাসদস্যদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধকে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বর্ণনা করেন।
সাত রেজিমেন্ট ও ব্যাটালিয়নকে জাতীয় পতাকা প্রদান
পেশাগত সাফল্য ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অনুষ্ঠানে সাতটি রেজিমেন্ট ও ব্যাটালিয়নকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করা হয়। এগুলো হলো—৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর)।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কূটনীতিক, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং সাবেক ও বর্তমান ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ।
সামগ্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সামরিক আধুনিকায়ন, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ—এই চারটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা ও জনগণের আস্থা ধরে রাখার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

