গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে ৭৫ মরদেহ উদ্ধার, পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
spot_img

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৭৫ জনের মরদেহ। দীর্ঘদিন ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থাকা এসব মরদেহ গতকাল রোববার সম্মিলিত জানাজার পর দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। এ ঘটনায় ফ্রান্সের এক মেয়রকে মারধর করা হয়েছে। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও।

- Advertisement -

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিবৃতিতে জানায়, গাজা সিটির দারাজ এলাকা থেকে ৭৫ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় ভবন ধসে এসব মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে মরদেহগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে গাজার সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপত্যকাটিতে এখনো ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় আট হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ পড়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজে সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অনেক মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে উপত্যকাটিতে প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭৪ হাজার ৪৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭৫ হাজার ৪৯২ জন আহত হয়েছেন। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ব্যক্তিদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা এবং হতাহতের তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত প্রাণহানি আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলের ওপর হামলা

গাজায় প্রাণহানির পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিনি গ্রাম তাইবেহের কাছে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি প্রতিনিধি দলের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে।

গত শনিবার ফিলিস্তিনি জলপাই সংগ্রহকারীদের পরিস্থিতি দেখতে সেখানে গিয়েছিল প্রতিনিধি দলটি। এ সময় বসতি স্থাপনকারীরা তাদের বাধা দেয় এবং মুখোমুখি অবস্থান নেয়। হামলার ঘটনায় বেলজিয়ামের কনসাল জেনারেল, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের কূটনীতিক এবং ক্যাথলিক প্রতিনিধিরা লক্ষ্যবস্তু হন বলে জানিয়েছেন বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো।

তিনি জানান, এ ঘটনায় ফ্রান্সের একজন মেয়রকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। এ ছাড়া বেলজিয়ামের একটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগের দিন রামাল্লার উত্তরে এক মার্কিন সাংবাদিকের ওপরও বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরপর এসব ঘটনায় অধিকৃত পশ্চিম তীরে বিদেশি নাগরিক ও পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জলপাই সংগ্রহে বাধা, বাড়ছে সহিংসতা

পশ্চিম তীরজুড়ে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার কারণে ফিলিস্তিনিদের ঐতিহ্যবাহী জলপাই সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জলপাই সংগ্রহ স্থানীয় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর জীবিকা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মৌসুমি এ কাজে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

বিভিন্ন এলাকায় এসব হামলাকে পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমিতে প্রবেশে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক হামলার ঘটনা পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চায় যুক্তরাষ্ট্র

পশ্চিম তীরে চরমপন্থি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সেখানে এক মার্কিন নারী আলোকচিত্রী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় ওয়াশিংটন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও পশ্চিম তীরের সহিংসতার ছবি ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ জানান। তিনি বলেন, এসব ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুবই উদ্বিগ্ন’। বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে ইসরায়েলকে আহ্বান জানানো হয়েছে এবং সেই আহ্বান অব্যাহত রয়েছে।

গাজায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ উদ্ধার এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ধারাবাহিক ঘটনা ফিলিস্তিনের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। একদিকে গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ, অন্যদিকে পশ্চিম তীরে সহিংসতা ও কৃষিকাজে বাধা—সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনিদের মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

সর্বশেষ