নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রকে দিল আরও বড় হামলার হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। তেহরানের সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নতুন করে হামলার মুখে পড়লে এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে পাল্টা আঘাত হানার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা বলে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করছে ইরান।

- Advertisement -

গত এক মাসে ইরানের সামরিক কমান্ডারদের একাধিক বক্তব্যে নতুন অস্ত্রের মজুত এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশটির কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি, সংঘাত আবার শুরু হলে শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেবল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

গত মাসের শেষ দিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, ইরানের হাতে এমন কিছু নতুন লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, যেগুলোতে এখনো হামলা চালানো হয়নি। তার ভাষ্য, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ব অবাক হয়ে যেতে পারে। তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানের সামরিক বাহিনী।

যুদ্ধের অনিশ্চয়তায় উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিপর্যস্ত দেশটির নাগরিকেরা আবারও বোমা হামলার পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে তেহরানের ৭০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন রাত-দিন হামলা শুরুর আশঙ্কায় অপেক্ষা করছেন তিনি। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দিয়ে রাখা এবং পানির মজুত গড়ে তোলাসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিয়েছেন।

দুই সন্তানের এক মা বলেন, সন্তানদের প্রতিদিন স্কুলে পাঠানোর সময় তিনি উদ্বেগে থাকেন। চলাচলের পথে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি এবং সামরিক স্থাপনাগুলোর সক্রিয়তা তার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নেতৃত্বকে সরাতে পারেনি, আলোচনার মাধ্যমেও সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি—তাহলে আবার যুদ্ধ শুরু করে কী অর্জন করতে চায়?

তেহরানের আরেক বাসিন্দার ভাষ্য, ইরানের মানুষের মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন কখন হামলা শুরু হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এতে মানুষের মানসিক চাপও বাড়ছে। নিরাপত্তার কারণে সিএনএনকে সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ইউরোপে মার্কিন ঘাঁটিও হতে পারে সম্ভাব্য লক্ষ্য

ইরানকে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে সিএনএন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। তবে তার প্রশাসনের কয়েকজন উপদেষ্টা এ সিদ্ধান্তের স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এসব পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা জিবিইউ-৪৩/বি, যা ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত, ব্যবহারের বিষয়টিও রয়েছে।

তবে ইরানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা শেখ দাবি করেছেন, এ ধরনের প্রচারণার উদ্দেশ্য ইরানের জনগণকে ভয় দেখানো। তার বক্তব্য, ইরানের জনগণই সব বোমার মা।

এদিকে, ইরানের সামরিক কৌশলে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত সপ্তাহে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে দেশজুড়ে সামরিক মহড়ার কথা জানানো হয়। ওই মহড়ায় একসঙ্গে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফারজিন নাদিমির মতে, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউরোপে হামলার সিদ্ধান্ত নিলে সেখানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইংল্যান্ডের বিমানঘাঁটি এবং জার্মানির রামস্টাইন সামরিক সরবরাহকেন্দ্র রয়েছে। তবে সংঘাত অত্যন্ত গুরুতর পর্যায়ে না পৌঁছালে ইরান এমন পদক্ষেপ নেবে না বলেই তার ধারণা।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সমন্বিত ড্রোন বহর তৈরি এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গতি বাড়ানোর মতো সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি সামরিক যোগাযোগ ও নজরদারিতে ব্যবহৃত স্যাটেলাইটের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টাও করতে পারে দেশটি। তবে এসব উন্নত সক্ষমতার সবকটির বাস্তব প্রয়োগের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও ডিজিটাল অবকাঠামো ঘিরে উদ্বেগ

ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলি ওয়ায়েজ সিএনএনকে বলেন, তেহরান বোঝাতে চাইছে যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে এবং এর পরিণতি আগের চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে।

তার মতে, ইরান যেসব পদক্ষেপকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে, যুক্তরাষ্ট্র সেগুলোকে উসকানি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এতে সংঘাত এড়ানোর পরিবর্তে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ সামরিক কমান্ডার, শীর্ষ কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা চালায়। তেহরানের অভিযোগ, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা, পানি শোধনাগার ও ডেটা সেন্টার আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান দেশটিকে লক্ষ্য করে আড়াই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। আমিরাতের দাবি, তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এসব হামলার প্রায় সবই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।

নতুন হামলা হলে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনা ও সম্পদে পাল্টা আঘাত হানা হতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভেতরে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

রেজায়ির বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সমুদ্রের তলদেশে থাকা যোগাযোগ কেবল, ডেটা সেন্টার, এআই-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা মোকাবিলায় তারা আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত। দেশটির ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান আলি আল-নুয়াইমি বলেছেন, তার দেশ যুদ্ধ চায় না। তবে জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের অনিশ্চয়তা এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিধি আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো ও বৈশ্বিক ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

সূত্র: সিএনএন

সর্বশেষ