মো.মোক্তার হোসেন বাবু: চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততা যেন নতুন করে প্রাণ পায় সূর্য ডোবার পর| দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে হাজারো মানুষ ভিড় জমান টেরিবাজার, রিয়াজুদ্দিন বাজার, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ, নিউমার্কেট কিংবা বিভিন্ন শপিং কমপ্লেক্সে। সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে জমে ওঠে কেনাবেচা, সরগরম হয়ে ওঠে নগরের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো। কিন্তু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা ব্যবসায়ীদের মনে ˆতরি করেছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পরই ক্রেতাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি থাকে| অফিস শেষ করে কিংবা বিভিন্ন কাজ সেরে সাধারণ মানুষ সাধারণত বিকেল ও সন্ধ্যার সময় বাজারমুখী হন| ফলে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হলে বিক্রির বড় একটি অংশ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাণিজ্য কেন্দ্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জেও একই ধরনের উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে| আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের মতে, পণ্য পরিবহন, লেনদেন ও বাজার ব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ সন্ধ্যার পর পর্যন্ত চলতে থাকে। নির্ধারিত সময়ের আগেই কার্যক্রম বন্ধ করতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু ঐতিহ্যবাহী বাজার নয়, আধুনিক শপিং কমপ্লেক্স ও বিপণিবিতানগুলোর ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। নগরের বিভিন্ন শপিং সেন্টারে সন্ধ্যার পর থেকেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। অনেকের মতে, এই সময়টুকুই তাদের ˆদনিক বিক্রির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয় অবশ্যই প্রয়োজন| তবে বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে| বিশেষ করে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিক্রয় কমে গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, জাতীয় স্বার্থে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া সময়ের দাবি| তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে বিকল্প ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে যে শহর আলো আর মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে, সেই চট্টগ্রাম এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন সন্ধ্যা ৭টার পর যদি বাজারের আলো নিভে যায়, তবে কি নিভে যাবে নগরের অর্থনৈতিক স্পন্দনেরও একটি বড় অংশ? সময়ই দেবে সেই উত্তর।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন যেখানে তীব্র গরমে দিনে মানুষ ঘর থেকেই বের হতে চায় না, সেখানে সন্ধ্যার ঠিক মোক্ষম সময়ে আলো নিভিয়ে দিলে তারা বাঁচবেন কী করে?
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কোনো বড় ব্যাংক ঋণ নেই, নেই কোনো সরকারি অনুদান| প্রতিদিনের উপার্জনেই চলে তাদের সংসার, কর্মচারীদের বেতন। রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি ছালামত আলী বুকভরা ক্ষোভ আর আকুতি নিয়ে বলেন, ব্যবসা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই ব্যবসায়ীরাই বছরে মোটা অঙ্কের ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে সরকারের আয়ের পথ সচল রাখে। আমরা সরকারের শত্রু নই, বন্ধু হয়ে পাশে থাকতে চাই। কিন্তু ১ জুন থেকে যে আদেশ আবার দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে| সরকারের উচিত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।
গত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় চট্টগ্রামের বাজারে কেনাকাটা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। সেই মন্দার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন এই নির্দেশনা যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’।
ঐতিহ্যবাহী টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল মান্নান ঈদের পর শপিংমল খোলার দিনে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বাস্তবতা হলো, চট্টগ্রামের প্রায় ৬০ শতাংশ ক্রেতাই সন্ধ্যার পর কেনাকাটা করতে আসেন| দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বিকেলে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছায়| ৭টার মধ্যে যদি ঝাঁপ বন্ধ করতে হয়, তবে আমাদের ব্যবসা বলতে আর কিছুই থাকবে না। দেশের লাখো মানুষের জীবিকা এই খুচরা ব্যবসার সাথে জড়িত কর্মচারী, সরবরাহকারী, ভ্যানচালক সবার ঘরেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়ীদের মনে বড় ক্ষোভের জায়গাটি হলো ˆবষম্য| বড় বড় ক্লাব, বিনোদন কেন্দ্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন গভীর রাত পর্যন্ত এসি চলে, আলোকসজ্জা হয়, তখন কেন শুধু খেটে খাওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরই বারবার কোপ পড়ে? যেখানে সরকারি রেকর্ড বলছে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, সেখানে কেন এই অন্ধকার নেমে আসবে শুধু বাজারের দোকানগুলোতে? চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মূল সংকট ও দাবি ৬০ শতাংশ ক্রেতাই আসেন সন্ধ্যার পর। তাই সকালের বদলে দুপুর ১২টা থেকে শপিংমলগুলো রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেয়া উচিৎ। দিনে তীব্র গরম ও কর্মব্যস্ততার কারণে মানুষ রাতেই বেশিরভাগ শপিং করতে আসে। এছাড়া বিভিন্ন ক্লাব ও সরকারি খাতে আলোকসজ্জাগুলো নিয়ন্ত্রনে এনে শপিংমলকে সুযোগ দেয়া উচিৎ।
বন্দরনগরীর অর্থনৈতিক ঐতিহ্য এবং লাখো মানুষের রুটি-রুজির কথা বিবেচনা করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতাদের একটাই আকুল দাবি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। সকালের ঘুমন্ত শহরের দোকান বন্ধ রেখে দরকার হলে দুপুর ১২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হোক। আলো জ্বলুক চট্টগ্রামের বাজারে, সচল থাকুক হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।




