মো. মোক্তার হোসেন বাবু :সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্য, একটি ছবি কিংবা একটি পোস্ট-কখনো কখনো সেটিই হয়ে উঠছে কারও জন্য দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তির কারণ। বন্ধুত্ব, আড্ডা ও বিনোদনের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত ভার্চুয়াল জগতে বাড়ছে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, ট্রল, ভুয়া আইডি, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, যৌন হয়রানি ও অনলাইন অপমানের মতো ঘটনা।
চট্টগ্রামেও সাম্প্রতিক সময়ে এমন কয়েকটি অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, সাইবার বুলিং ও যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে পাঁচ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। একটি ফেসবুক পেজের পোস্টকে কেন্দ্র করে মেসেঞ্জার গ্রুপে শুরু হওয়া বিতর্ক পরে গড়ায় ওই শিক্ষার্থীকে নিয়ে আলাদা গ্রুপে অশালীন ও যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যে।
অভিযোগের আরও গুরুতর দিক হলো, ওই শিক্ষার্থীর এক বন্ধুর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করে একটি ট্রল গ্রুপের কভার ছবি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন।
এটি অবশ্য ক্যাম্পাসে প্রথম ঘটনা নয়। চলতি বছরের মে মাসেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফেসবুক গ্রুপে এক নারী শিক্ষার্থীকে অশালীন ভাষায় আক্রমণের অভিযোগ ওঠে। তার একটি মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে পরিচয় গোপন করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছিল। পরে গ্রুপের অ্যাডমিন ও মডারেটরের মাধ্যমে মন্তব্যকারীর পরিচয় প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটি নিয়ে ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনা হয়।
অনলাইনের অপমান, বাস্তব জীবনে চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার বুলিংয়ের বড় সমস্যা হলো এর কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সময় নেই। সামনাসামনি হয়রানি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, কিন্তু অনলাইনে একটি ছবি বা মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে সেটি মুছে ফেললেও কপি, স্ক্রিনশট কিংবা অন্য অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ফলে ভুক্তভোগীর জন্য বিষয়টি একবারের ঘটনা হয়ে থাকে না। প্রতিবার নতুন করে পোস্ট বা ছবি সামনে আসার সঙ্গে তৈরি হতে পারে ভয়, লজ্জা, সামাজিক চাপ ও মানসিক অস্বস্তি।
বাংলাদেশে সাইবার হয়রানির বিভিন্ন ধরন নিয়ে পরিচালিত আগের গবেষণাতেও ভুয়া অ্যাকাউন্ট, যৌন হয়রানিমূলক বার্তা, ছবি ও ভিডিও এবং অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের পরামর্শ, এমন পরিস্থিতিতে চুপ না থেকে পরিবার, শিক্ষক বা আইনগত সহায়তার কাছে যাওয়া জরুরি।
সংকটের প্রকাশও হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে ব্যক্তিগত সংকটের কিছু ঘটনাও সামনে এসেছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে সাইবার বুলিংয়ের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করার মতো তথ্য নেই।
চলতি বছরের মার্চে ফটিকছড়িতে মুহাম্মদ আলী মর্তুজা (২২) নামে এক যুবক ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করেন। একইভাবে জুনে চট্টগ্রাম নগরের এক ব্যবসায়ী চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে ফেসবুক লাইভে এসে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। দুটি ঘটনাই দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংকট প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ধরনের ঘটনায় আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে অনুমান না করে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গণমাধ্যম নির্দেশনাতেও আত্মহত্যার ঘটনায় ছবি, ভিডিও, স্ক্রিনশট বা সংশ্লিষ্ট পোস্টের লিংক প্রকাশে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
আইনি লড়াইও বাড়ছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক বিরোধ ও হয়রানির অভিযোগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আইনি কার্যক্রমেও। চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কার্যতালিকায় ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে সাইবার পিটিশন ও সাইবার মামলার কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে।
১৬ সেপ্টেম্বরের কার্যতালিকায় ৪৯৪/২০২৬ থেকে ৪৯৭/২০২৬ পর্যন্ত একাধিক নতুন সাইবার পিটিশন মামলার কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব মামলা ও পিটিশনের প্রকৃতি ভিন্ন হলেও অনলাইন কর্মকাণ্ড ঘিরে আইনি প্রতিকার চাওয়ার প্রবণতা যে রয়েছে, তা কার্যতালিকায় প্রতিফলিত হচ্ছে।
‘মজা’ থেকে অপরাধ
অনলাইনে কাউকে নিয়ে ট্রল বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা অনেকের কাছে নিছক ‘মজা’ মনে হতে পারে। কিন্তু যার ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কাছে বিষয়টি অপমান, হয়রানি কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে পরিচয় ব্যবহার, যৌন হয়রানিমূলক বার্তা পাঠানো কিংবা কাউকে উদ্দেশ্য করে অপমানজনক কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু অনলাইন আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ড আইনি অভিযোগেরও বিষয় হতে পারে।
ইউনিসেফের পরামর্শ অনুযায়ী, সাইবার বুলিংয়ের শিকার শিশু-কিশোরদের উচিত বিষয়টি অভিভাবক, শিক্ষক বা বিশ্বাসযোগ্য কোনো ব্যক্তিকে জানানো। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিপোর্টিং ব্যবস্থাও ব্যবহার করা যেতে পারে।
সচেতনতার বিকল্প নেই
চট্টগ্রামে তরুণদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটাচ্ছে। এই বাস্তবতায় ডিজিটাল আচরণ, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং অনলাইন হয়রানি সম্পর্কে সচেতনতা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারকে যেমন সন্তানের অনলাইন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ এলে দ্রুত ও সংবেদনশীলভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে। ভুক্তভোগীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ ভার্চুয়াল জগতের আড়ালে থাকা প্রতিটি অ্যাকাউন্টের অপর পাশে একজন মানুষ আছেন। তারও রয়েছে ব্যক্তিগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অনুভূতি। অনলাইনে একটি ‘মজা’ অন্য কারও জীবনে যেন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি না করে-সেই দায়িত্ব ব্যবহারকারীদের সবার।




