প্রতিদিন দুপুরের খাবারের পেছনে শেখ হাসিনার অফিস থেকে সাড়ে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হতো, যা বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম মণি। বিপরীতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাত্র ১৫০ টাকায় দুপুরের খাবার খান বলে দাবি করেছেন তিনি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে আট দিনের সফরে বরগুনায় পৌঁছে সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন চিফ হুইপ।
তারেক রহমানের সাধারণ জীবনযাপনের কথা তুলে ধরে নূরুল ইসলাম মণি বলেন, সম্প্রতি তারেক রহমান জানিয়েছেন, দেশের একটি পয়সাও তাঁর হাত দিয়ে অপচয় হতে দেবেন না। দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত তিনি এই নীতিতে চলতে চান বলেও উল্লেখ করেন চিফ হুইপ।
তিনি জানান, গত পরশু দুপুরে তারেক রহমানের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খেয়েছেন। সে সময় খাবারের তালিকায় ছিল ডেরস ভাজি, কুমড়া ভর্তা ও ডাল। তারেক রহমানের সাধারণ জীবনযাপন ও পোশাক-পরিচ্ছদের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মানুষের মূল্যায়ন হবে হৃদয় ও বিশ্বাস দিয়ে
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়নের বিষয়টি তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক অবয়ব দেখবেন না; বরং মানুষের হৃদয়, ঈমান ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিচার করবেন। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও তাঁর হৃদয় ও বিশ্বাসকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নূরুল ইসলাম মণির ভাষ্য, তারেক রহমানের মতো একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য এটি সৌভাগ্যের বিষয়। তাঁর পরিবর্তে অন্য কেউ দায়িত্ব নিলে আরও ভালোভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সংসদ সদস্যদের কর্মীবান্ধব হওয়ার নির্দেশ
সংসদের বিশেষ সভায় তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের কর্মীদের পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নেতা-কর্মীরা তাঁদের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে ভূমিকা রেখেছেন।
তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেছেন, তাঁরা যেন কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে চলেন এবং তাঁদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। কর্মীরাই দলের মূল শক্তি—এ বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ।
চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
দেশে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সন্ত্রাসের কোনো স্থান থাকবে না বলে তারেক রহমান কঠোর বার্তা দিয়েছেন বলে জানান নূরুল ইসলাম মণি। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, তাঁর বহিষ্কারের চেয়ে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে থাকছে না দলীয় প্রতীক
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম মণি বলেন, নির্বাচনে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হবে। এ নির্বাচনে ধানের শীষ, নৌকা কিংবা অন্য কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না।
তাঁর মতে, প্রতীককে কেন্দ্র করে অনেক সময় ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, এমন জনপ্রিয় ব্যক্তিরাও যাতে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হতে পারেন, সে সুযোগ নিশ্চিত করাই এ ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেন চিফ হুইপ। তিনি একে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেন।
অতীতের দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যসংকটের প্রসঙ্গ
দেশের অতীত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আসার সময় তিনি মানুষ ও কুকুরকে একই ডাস্টবিন থেকে খাবার সংগ্রহ করতে দেখেছেন। সে সময় অনাহারে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি রক্ষীবাহিনী ও বাকশালের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
নূরুল ইসলাম মণির দাবি, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তিন বছরের মধ্যে দেশের খাদ্যসংকট দূর করেছিলেন। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি সেনেগালে খাদ্য ও চাল রপ্তানি করেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
১৭ বছরে অর্থনীতি ও গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে: চিফ হুইপ
গত ১৭ বছরে দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন নূরুল ইসলাম মণি। তাঁর ভাষ্য, এমন পরিস্থিতিতে তারেক রহমান দেশের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং মানুষের জীবনমান রক্ষায় কাজ করার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, দেশের সংকটময় সময়ে ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির ওপর দায়িত্ব এসে পড়ে। তারেক রহমানও গণতন্ত্রের উন্নয়ন ও দেশের পরিস্থিতি পুনর্গঠনে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ।
বরগুনায় সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন, দলীয় শৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং অতীতের অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে এসব বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি।

