দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ফর্টিফাইড সয়াবিন তেলে কোনো ভারী ধাতু পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। সংস্থাটির ভাষ্য, খোলাবাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৯৩টি নমুনা নিজস্ব অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে কোনো নমুনাতেই ভারী ধাতুর অস্তিত্ব মেলেনি। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় সয়াবিন তেলে বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এ বক্তব্য দিয়েছেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবে বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষে বিএসটিআই আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিএসটিআই বাজার থেকে ১৯৩টি ফর্টিফাইড সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। পরীক্ষায় কোনো নমুনায় ভারী ধাতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ পরীক্ষার ভিত্তিতে তিনি বাজারে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলের বিশুদ্ধতা নিয়ে আশ্বস্ত করেন।
তবে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষার ফলাফল কোন কোন ভারী ধাতুর উপস্থিতি যাচাইয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, নমুনাগুলো কোন সময় ও কোন কোন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আলোচিত গবেষণার সঙ্গে পরীক্ষার পদ্ধতির কী পার্থক্য রয়েছে, সে বিষয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়নি।
ভেজাল ঠেকাতে বাড়বে তদারকি
শিল্পমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ বন্ধে বিএসটিআইয়ের নজরদারি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির জনবল বৃদ্ধি এবং কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু নজরদারি বাড়ালেই হবে না, আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশজুড়ে বিএসটিআইয়ের তদারকি কার্যক্রম বিস্তৃত করা গেলে নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকির পাশাপাশি পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, পর্যাপ্ত জনবল এবং নিয়মিত নমুনা পরীক্ষার গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা হলে ভোক্তাদের আস্থা বাড়বে।
মানচিহ্নে আস্থা তৈরিই বিএসটিআইয়ের বড় অর্জন
অনুষ্ঠানে শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন দেখে ক্রেতাদের মধ্যে পণ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আস্থা তৈরি হওয়াই প্রতিষ্ঠানটির বড় অর্জন। এ ধরনের অর্জন ধরে রাখতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মানসম্মত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে সম্ভব নয়। উৎপাদক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
বাজারে নকল ও ভেজাল পণ্যের বিস্তার রোধে বিএসটিআইয়ের মানচিহ্নের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মানচিহ্নের অবৈধ ব্যবহার ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং প্রকৃত মানসম্মত পণ্যের প্রতি আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নকল ও ভেজাল রোধে পৃথক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রস্তাব
বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক নকল ও ভেজাল পণ্য উৎপাদন এবং বিএসটিআইয়ের মানচিহ্নের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে পৃথক গোয়েন্দা ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে মানচিহ্নের অপব্যবহার শনাক্ত করা, অননুমোদিত পণ্য বাজারজাতকরণে জড়িতদের চিহ্নিত করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে বিশেষায়িত নজরদারি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ধারাবাহিক নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ।
হালাল সনদের স্বীকৃতি পেল বিএসটিআই
বিশ্ব মান দিবসের অনুষ্ঠানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) কাছ থেকে হালাল সার্টিফিকেশন অ্যাক্রেডিটেশন সনদ পেয়েছে বিএসটিআই।
অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রীর মাধ্যমে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হকের হাতে সনদ তুলে দেন বিএবির মহাপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম।
বিএসটিআইয়ের আশা, এই স্বীকৃতির ফলে হালাল পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ এবং সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এটি সহায়ক হবে।
হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থায় স্বীকৃত মানদণ্ড ও নির্ভরযোগ্য যাচাইপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে দেশীয় উৎপাদকদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সনদ প্রদানের ধারাবাহিকতা, মান যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক শর্ত পূরণও গুরুত্বপূর্ণ।
ভোক্তার আস্থা ধরে রাখতে প্রয়োজন স্বচ্ছ পরীক্ষা
সয়াবিন তেলে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা ভোক্তাদের জন্য খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। বিএসটিআইয়ের ১৯৩টি নমুনা পরীক্ষায় ভারী ধাতু পাওয়া না যাওয়ার দাবি আশ্বস্ত করার মতো তথ্য হলেও এর পরিধি ও পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করা হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের জন্য নমুনা সংগ্রহের স্থান ও সময়, পরীক্ষায় বিবেচিত ধাতুর ধরন, শনাক্তকরণের সীমা এবং প্রযোজ্য মানদণ্ডের মতো তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্দিষ্ট কিছু নমুনার পরীক্ষার ফল দিয়ে বাজারের প্রতিটি পণ্যের সব ধরনের দূষণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অনুষ্ঠানে বিএসটিআইয়ের পরিচালক (মান) মো. সাইদুল ইসলামসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, আমদানি-রপ্তানিকারক এবং মান প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত পণ্যের বাজার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে নিয়মিত পরীক্ষা, ফলাফল প্রকাশ, আইন প্রয়োগ এবং ভোক্তাদের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর।

