নির্বাচনের আগে ইরানে হামলায় আগ্রহী নন নেতানিয়াহু, হিজবুল্লাহকে কঠোর হুঁশিয়ারি

ইসরায়েলে হামলা হলে পাল্টা জবাবের ঘোষণা, দক্ষিণ লেবাননে আরও ভূখণ্ড হারানোর আশঙ্কায় হিজবুল্লাহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পক্ষে নন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ইরান কিংবা দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলে হামলা চালালে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। একই সময়ে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সতর্ক করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, নতুন করে হামলা চালালে দক্ষিণ লেবাননে গোষ্ঠীটি আরও ভূখণ্ড হারাতে পারে।

- Advertisement -

বুধবার ইসরায়েলের আর্মি রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানো ইসরায়েলের জন্য সুবিধাজনক হবে না। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে তিনি সামরিক সংঘাত উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে বিরোধীদের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যে নির্বাচনের আগে নতুন করে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে অনাগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও ইরান ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন তিনি। ফলে সামরিক উত্তেজনা কমানোর সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন সংঘাতের ঝুঁকিও রয়ে গেছে।

ফেব্রুয়ারির হামলা থেকে শুরু যুদ্ধ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনের পর থেকে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি হামলা হয়নি। তবে দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ইসরায়েলের নিরাপত্তা হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন হামলা চালানো রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিতর্কও সামনে এসেছে। নেতানিয়াহু অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচনী স্বার্থে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ মানতে নারাজ।

হামলা হলে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি

নেতানিয়াহু নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার পক্ষে না থাকলেও ইরান বা দেশটির মিত্রগোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, ইসরায়েল নিজে থেকে নতুন সংঘাত শুরু করার বিষয়ে সতর্ক থাকলেও আক্রান্ত হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।

এ অবস্থান থেকে বোঝা যায়, নির্বাচনের আগে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি এড়িয়ে চলার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার কৌশল অনুসরণ করতে চাইছে ইসরায়েল। তবে ইরান বা তাদের মিত্রদের কোনো হামলা হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।

হিজবুল্লাহকে দক্ষিণ লেবানন নিয়ে সতর্কবার্তা

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ লেবাননের হিজবুল্লাহকে নতুন করে হামলা না চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালালে দক্ষিণ লেবাননে গোষ্ঠীটি আরও ভূখণ্ড হারাতে পারে। ওই এলাকার কিছু অংশ ইসরায়েলের স্থায়ী নিরাপত্তা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

কাৎজ আরও বলেছেন, হিজবুল্লাহ হামলা চালালে বৈরুতে গোষ্ঠীটির শক্ত ঘাঁটিগুলোও ইসরায়েলি হামলা থেকে রেহাই পাবে না।

এই বক্তব্য লেবানন সীমান্তে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশটির সার্বভৌমত্ব, সীমান্তের নিরাপত্তা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে হিজবুল্লাহ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ নিতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এতে লেবাননের শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফলে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতের প্রভাব লেবানন সীমান্তেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এবং হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের স্থায়ী নিরাপত্তা অঞ্চল গঠনের হুমকি বাস্তবায়িত হলে সংঘাতের প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এতে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার পথ কঠিন হওয়ার পাশাপাশি লেবাননের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও চাপে পড়তে পারে।

নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হিসাব

ইসরায়েলের নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহুর ইরানবিষয়ক বক্তব্য এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর হিজবুল্লাহকে দেওয়া হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে নির্বাচনের আগে ইরানে সরাসরি হামলা এড়িয়ে চলার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা হলে কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে ইরান, ইসরায়েল এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। নির্বাচনের আগে নতুন হামলা শুরু না হলে সরাসরি সংঘাত এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ইরান বা হিজবুল্লাহর কোনো হামলা কিংবা ইসরায়েলের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ সেই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

সর্বশেষ