কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে দুই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ ছয় চাকরিজীবীকে পদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের দায়িত্বেও রয়েছেন দুই প্রধান শিক্ষক। অন্য চারজনের মধ্যে তিনজন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং একজন অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিবিধি ও দলীয় গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে কমিটির বিরোধিতা করছেন স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতা-কর্মীরা।
তাঁদের অভিযোগ, দলের দুর্দিনে রাজপথে সক্রিয় থাকা নেতা-কর্মীদের উপেক্ষা করে চাকরিজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে বলে জানিয়েছেন কমিটির এক যুগ্ম আহ্বায়ক। অন্যদিকে, নবনির্বাচিত আহ্বায়ক শামসুজ্জামান হাসু বলেছেন, তিনি ও সদস্যসচিব চাকরি ছেড়ে দেবেন।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান ও সদস্যসচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদের যৌথ স্বাক্ষরে ২০ সদস্যের এ আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রধান দুই পদে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক
ঘোষিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে উপজেলার রোশন শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুজ্জামান হাসুকে। সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন পূর্ব কুরুষা ফিরুষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান মুকুল।
এ ছাড়া কমিটির সদস্য হয়েছেন পশ্চিম কবির মামুদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন, যতীন্দ্র নারায়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল, সরকারি সাইফুর রহমান কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক শাহিনুর রহমান এবং অগ্রণী ব্যাংকের ফুলবাড়ী শাখার সিনিয়র কর্মকর্তা তহিদুল হক।
অর্থাৎ কমিটির শীর্ষ দুই পদসহ ছয়টি পদে চাকরিজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ নিয়েই মূলত স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে আপত্তি দেখা দিয়েছে।
চাকরিবিধি ও দলীয় গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের অভিযোগ
বিএনপির স্থানীয় নেতাদের একাংশের দাবি, সরকারি চাকরিতে থেকে রাজনৈতিক দলের কমিটিতে পদ গ্রহণ করা বিধিবহির্ভূত। তাঁদের মতে, সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে নিরপেক্ষতা ও চাকরির শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫(১) অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চাকরির ধরন, তাঁদের ওপর প্রযোজ্য নির্দিষ্ট বিধান এবং কমিটিতে পদ গ্রহণের প্রকৃতি যাচাই করে আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় বিএনপির একাংশের অভিযোগ, শুধু চাকরিবিধিই নয়, দলীয় গঠনতন্ত্রের সঙ্গেও কমিটির এই বিন্যাসের অসংগতি রয়েছে। তবে দলীয় গঠনতন্ত্রের কোন নির্দিষ্ট ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে, সে বিষয়ে অভিযোগকারীরা বিস্তারিত উল্লেখ করেননি।
‘দুঃসময়ে রাজপথে ভূমিকা ছিল না’
ঘোষিত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দলীয় গঠনতন্ত্র ও সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে ছয়জনকে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। দুঃসময়ে রাজপথে তাঁদের কোনো ভূমিকা ছিল না। এই কমিটি নেতা-কর্মীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
আরিফুর রহমানের অভিযোগ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। নেতা-কর্মীরা এখন কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
তবে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে জেলা বিএনপির নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কী বিবেচনা করা হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘আমি ও সদস্যসচিব চাকরি ছেড়ে দেব’
সরকারি চাকরিতে থেকে দলীয় পদ গ্রহণের বিষয়ে অভিযোগের জবাবে উপজেলা বিএনপির নবনির্বাচিত আহ্বায়ক শামসুজ্জামান হাসু বলেন, ‘আমি ও আমার সদস্যসচিব চাকরি ছেড়ে দেব। আপনারা চিন্তা করবেন না। আগামীকাল চাকরিতে ইস্তফা দেওয়ার কাগজ পেয়ে যাবেন।’
তবে তাঁর এ বক্তব্যের পর চাকরি থেকে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সদস্যসচিব আব্দুল মান্নান মুকুলও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেননি। বুধবার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলব।’
শিক্ষা বিভাগ বলছে, সত্যতা পেলে জানানো হবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে
বিষয়টি সম্পর্কে ফুলবাড়ী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে এখনো কাগজপত্র পাইনি। সরকারি শিক্ষকদের রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। সত্যতা পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’
অর্থাৎ অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা বিভাগ এখনো আনুষ্ঠানিক নথিপত্র পায়নি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দলীয় পদ গ্রহণের বিষয়টি যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা
কমিটির সদস্য তহিদুল হক অগ্রণী ব্যাংকে কর্মরত থাকার পাশাপাশি বিএনপির উপজেলা কমিটিতে পদ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
অগ্রণী ব্যাংকের কুড়িগ্রাম অঞ্চলপ্রধান আহসান হাবিব সরকার বলেন, প্রবিধান অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত থাকতে পারবেন না। তহিদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কমিটি নিয়ে এখন কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি চাকরিতে থেকে রাজনৈতিক পদ গ্রহণের প্রশ্ন এবং দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে কি না, সেই বিতর্ক। একদিকে চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিটি বাতিল বা সংশোধনের দাবি উঠেছে, অন্যদিকে আহ্বায়ক চাকরি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পদত্যাগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ, শিক্ষা বিভাগ ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের যাচাই এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে। অভিযোগের সত্যতা ও বিধিগত অবস্থান স্পষ্ট হলে কমিটির বৈধতা নিয়ে চলমান বিতর্কেরও নিষ্পত্তি হতে পারে।

