খুলনায় ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত পরিদর্শককে দেখতে হাসপাতালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণা
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের হামলার শিকার হলে তাঁদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, পুলিশকে দায়িত্ব পালনে বারবার বাধাগ্রস্ত করা হলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনকালে কোনো পুলিশ সদস্য সন্ত্রাসী বা বিপথগামী ব্যক্তির হামলার শিকার হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে খুলনায় ছিনতাইকারীদের হামলায় গুরুতর আহত পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলমকে দেখতে গিয়ে এসব কথা বলেন আইজিপি। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অভিযানে গিয়ে অপরাধীদের হামলার শিকার পুলিশ
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে খুলনার দৌলতপুর এলাকায় অভিযান শেষ করে বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। তিনি তখন সাদা পোশাকে ছিলেন। পথে তিন ছিনতাইকারী তাঁর গতিরোধ করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর দুই হাতে কোপ দেওয়া হয়। এতে তাঁর দুই হাতের ১২টি রগ কেটে যায়।
গুরুতর আহত শাহ আলমকে প্রথমে খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। বুধবার হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গিয়ে আইজিপি জানান, শাহ আলমের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং তিনি মোটামুটি ভালো আছেন।
এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
‘আইন প্রয়োগে নাগরিকদেরও সহযোগিতা করতে হবে’
আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, দেশজুড়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। তবে বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা পুলিশ সদস্যদের ওপরও চড়াও হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নাগরিকদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং পুলিশকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানায় ঘেরাও এবং সড়কে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময়ের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে অপরাধীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের অভাব থাকায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
আইজিপির ভাষ্য, পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব শুধু বাহিনীর সদস্যদের ওপর নয়, সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও পড়তে পারে। তাই অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।
মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান
আইজিপি জানান, সারা দেশে মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। অপরাধপ্রবণ এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যৌথ চেকপোস্ট স্থাপন ও যৌথ অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক গুলির ঘটনা ও অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধু নজরদারি বাড়ানো নয়, অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে ব্যাপকভাবে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দুর্গাপূজায় মণ্ডপে থাকবে স্বেচ্ছাসেবক
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইজিপি। তাঁর ভাষ্য, পূজার নিরাপত্তা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। জেলা, বিভাগ ও উপজেলা পর্যায়েও পূজা উদ্যাপন কমিটির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হবে। তাঁরা পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন। কোথাও কোনো অনিয়ম দেখা গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আইজিপি বলেন, পূজা উদ্যাপন কমিটিগুলো পুলিশের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট রয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
যৌন হয়রানির ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখবেন আইজিপি
সম্প্রতি এক নারীকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাঁর মামাকে আইনের আওতায় আনার ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন আইজিপি। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকার পরও ভুক্তভোগী যথাযথ সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং প্রতিবাদকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ কী।
জবাবে আলী হোসেন ফকির বলেন, পুলিশ সহায়তা না করে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ওই নারীর মামা কেন আইনের আওতায় এলেন, সেটিও খতিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।
বিষয়টি নিজে তদন্ত করে দেখার আশ্বাস দিয়ে আইজিপি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা বা অনিয়ম হয়ে থাকলে তা যাচাই করা হবে।
পুলিশ ও সাংবাদিকদের কাজের প্রশংসা
সাংবাদিকদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, পুলিশ ও সাংবাদিকেরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে ২৪ ঘণ্টা কাজ করেন। সাংবাদিকেরা সমাজের দর্পণ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশের কার্যক্রমের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসার বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরায় তিনি সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান।
সব মিলিয়ে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন আইজিপি। তাঁর বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হলে পুলিশকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

