নিত্যপণ্যের চাপে জনজীবন বিপর্যস্ত, ক্ষোভে উত্তাল ইউরোপের ৪ দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভ, ফ্রান্সে গ্রেপ্তার ১২০০

- Advertisement -

বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও রাজপথে ক্ষোভ; সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে চাপে সরকারগুলো

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, কম মজুরি ও শিক্ষাব্যবস্থার ব্যয় নিয়ে জনঅসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব সমস্যার প্রতিবাদে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও শান্তিপূর্ণ মিছিল সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে, কোথাও সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবারের বিক্ষোভে সবচেয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় ফ্রান্সে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সেখানে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১৫০ জন পুলিশ সদস্য।

ফ্রান্সের বাইরে বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও মানুষের ক্ষোভ রাজপথে প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তৈরি হওয়া এই অসন্তোষ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিভিন্ন দেশে নির্বাচন সামনে থাকায় পরিস্থিতি সরকারগুলোর জন্য রাজনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে।

ফ্রান্সে সহিংসতা, ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি ভবন ও দোকানপাট

কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভের একপর্যায়ে সহিংস গোষ্ঠীগুলো সরকারি ভবন, বিলাসবহুল দোকান ও সুপারমার্কেটে হামলা চালায়। বিভিন্ন স্থানে লুটপাটের পাশাপাশি পুলিশের গাড়ি ও কর্মকর্তাদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। মধ্য প্যারিসে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের পরিদর্শন করে তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী প্যারিসের পাশাপাশি মার্সেই, নিস, নান্তেস, বর্দো, লিমোজ, লিলি, তুলুজ ও স্ট্রাসবুর্গেও দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়েছে।

লিমোজ শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো টাউন হল প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। মার্সেই ও লিলির টাউন হলও ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। লিওঁ শহরে আগুন দেওয়া হয়েছে প্রধান পর্যটন কার্যালয়ে। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।

সহিংসতার ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি জানান, এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।

বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে টিয়ার গ্যাস

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবারের বিক্ষোভে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

ব্রাসেলসের পূর্বাঞ্চলের শহর লিয়েজেও বিক্ষোভ দমনে জলকামান মোতায়েন করা হয়। তবে এসব কর্মসূচিতে মোট কতজন অংশ নিয়েছেন, সে বিষয়ে পুলিশ নির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি।

শিক্ষাব্যয়ের চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো ইউরোপের তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। বেলজিয়ামের সাম্প্রতিক আন্দোলনেও শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও শিক্ষার খরচ নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে।

আবাসন সংকটে ক্ষুব্ধ পর্তুগালের মানুষ

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং আবাসন সংকটের প্রতিবাদে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মিছিল করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশটিতে বাড়ি কেনা ও ভাড়া নেওয়ার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম অর্ধেকেরও বেশি বেড়েছে। নতুন ভাড়ার চুক্তির ক্ষেত্রেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষ করে বড় শহরগুলোর বাসিন্দারা আবাসন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, আয় বৃদ্ধির তুলনায় বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ অনেক দ্রুত বাড়ছে।

তবে আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে সরকারের অবস্থান কঠোর। পর্তুগালের পার্লামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম শুক্রবার বলেন, সরকার রাজপথের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

ইতালিতে সংঘর্ষ, আটক অর্ধশতাধিকের কাছাকাছি

ইতালির মিলানেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে। প্রথমে শান্তিপূর্ণ মিছিল হলেও পরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশের দিকে পাথর ও ইটের টুকরো নিক্ষেপের পাশাপাশি রাস্তার আসবাব দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। সংঘর্ষের কারণে মিলানের কেন্দ্রস্থলের পিয়াজ্জা দেল দুওমো এবং একটি বিলাসবহুল বিপণিবিতান এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিভিন্ন দোকানপাট লুটপাট ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটে।

ইতালীয় বার্তা সংস্থা লা প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনায় অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। অনেক অপ্রাপ্তবয়স্কসহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে, কিন্তু শহরে আগুন দেওয়া বা সম্পত্তি ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।

মিলানের কেন্দ্র-বামপন্থী মেয়র গিউসেপ্পে সালা বলেন, বিক্ষোভের পেছনে থাকা দাবিগুলো যৌক্তিক হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা এবং শহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি গ্রহণযোগ্য নয়। বোলোনিয়া শহরেও বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

ফ্রান্স ছাড়িয়ে অন্য দেশেও ছড়াতে পারে আন্দোলন

ইউরোপজুড়ে একই সময়ে একাধিক বিক্ষোভের ঘটনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এইচইসি প্যারিস বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, অন্য দেশগুলোতে বিক্ষোভ ফ্রান্সের মতো বড় আকার না নিলেও ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে।

তাঁর মতে, ফ্রান্স বর্তমানে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হলেও এর প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে অন্য দেশেও পড়তে পারে। গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায়ও অসন্তোষের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও বড় সমাবেশ হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব আন্দোলনের পেছনে একাধিক অভিন্ন কারণ রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনের উচ্চমূল্য, শিক্ষার খরচ, অপর্যাপ্ত মজুরি এবং পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণ ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।

নির্বাচন সামনে, বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিক্ষোভ সরকারগুলোর জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক সংকট ও জনজীবনের ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষ নির্বাচনী বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

অধ্যাপক আলেমান্নোর মতে, এসব বিক্ষোভ আগামী দিনে ইউরোপের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসবে। সরকারগুলো কীভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট ও শিক্ষার খরচ মোকাবিলা করে, তার ওপর জনসমর্থনের একটি বড় অংশ নির্ভর করতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলাজনিত ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ। তবে অর্থনৈতিক দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে সহিংসতা ও ভাঙচুর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই অসন্তোষ মোকাবিলায় সরকারগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে কি না, সেটিই এখন ইউরোপের রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন।

সর্বশেষ