প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রস্তুতি, নিরাপত্তায় ২০ হাজার সদস্য

মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম:
spot_img

মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম: শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দের মধ্যে এবার বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফর। আগামী মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) নগরের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নগরজুড়ে চলছে প্রস্তুতি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নেওয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশ, এসআরবি, আনসার ও বিজিবির ২০ হাজারের বেশি সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন।

- Advertisement -

প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দুর্গোৎসব উপলক্ষে কোনো প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফর এবারই প্রথম। ফলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এ সফরকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।

সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে পৌঁছাবেন। সেখানে প্রায় ৪০ মিনিট অবস্থান করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও আর্থিক অনুদান দেবেন। এরপর নগরের হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন তিনি। রাতে সেখান থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

নিরাপত্তার চাদরে নগর

প্রধানমন্ত্রীর সফর ও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে নগর ও জেলার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, পূজামণ্ডপ ও জনসমাগমস্থলে বাড়তি নজরদারির পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স।

এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে এসএসএফের নির্দেশনা ও সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। র‍্যাব, পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন, মোবাইল টহল এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মণ্ডপের নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে র‍্যাবের যোগাযোগ নম্বরও দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে নগরে সর্বাত্মক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সড়ক সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ

প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নগরের বিভিন্ন সড়ক সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার কাজ চলছে। সফরস্থল ও যাতায়াতের পথ ঘিরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সফরকে সামনে রেখে গত ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে বিএনপি, মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হয়। ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রেস্ট হাউসেও প্রস্তুতিসংক্রান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন রাতে পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নেতৃত্বে প্রশাসন ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে অনলাইন সভা হয়। একই রাতে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতা এবং মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতারাও বৈঠক করেন।

গত শনিবার সকালে জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সমন্বয়ক, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান। একই দিন মণ্ডপ পরিদর্শন করেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ও এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান। পরে সেখানে যান সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।

সম্প্রীতির বার্তা দেখছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, প্রথমবারের মতো দেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে আসছেন। তাঁর আগমনের খবরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, রহমতগঞ্জের জে এম সেন হল চট্টগ্রামের দুর্গাপূজা উদযাপনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিবছর এখানে কেন্দ্রীয়ভাবে পূজার আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মণ্ডপটি সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়।

চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার যে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করেছেন, তা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাঁর চট্টগ্রাম আগমন আনন্দের বিষয়। সফরটি সফল ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।

চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে অপেক্ষা করছেন। তাঁর আগমন ঘিরে নগরে উৎসাহ ও আন্তরিকতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সব ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি চর্চা করতে পারবেন।

৫০ লাখ টাকার উপহার বিতরণ

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে উপহার ও আর্থিক সহায়তা কার্যক্রমও চালানো হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম জানান, জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার শাড়ি ও লুঙ্গি বিতরণ করা হয়েছে। বিএনপির সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের বিভিন্ন মন্দির, সংগঠন ও পূজা উদযাপন কমিটির কাছে এসব উপহার পৌঁছে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন, সেই মাঠেই গত ৯ অক্টোবর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পূজার উপহার বিতরণ করেন। এ ছাড়া নগর ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।

মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দর থেকে সরাসরি জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে যাবেন। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। তাঁর মতে, এ সফর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যের বার্তাকে আরও জোরালো করবে।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে প্রশাসনিক তৎপরতা, নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট সবার লক্ষ্য, নিরাপদ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপন এবং প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা।

সর্বশেষ