প্রবাসীদের ‘অ্যাম্বাসেডর’ হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর, তুলে ধরলেন সংস্কার পরিকল্পনা

জাপানে বিনিয়োগ বাড়ানো, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, বন্ধ কারখানা চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব

প্রিয় সংবাদ অনলাইন:
spot_img

প্রিয় সংবাদ অনলাইন: জাপানে বিনিয়োগ বাড়ানো, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, বন্ধ কারখানা চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়াতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদেশের মাটিতে বসবাসরত প্রতিটি বাংলাদেশিকে দেশের প্রতিনিধি বা ‘অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, জাপানি ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরলে দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও দেশের মানুষ উপকৃত হবে।

- Advertisement -

একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে আসে, এমন সংস্কারই এখন সবচেয়ে জরুরি।

স্থানীয় সময় বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে জাপানের টোকিওতে হোটেল নিউ ওতানির হলরুমে প্রবাসী বাংলাদেশি ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ কমিউনিটি জাপান আয়োজিত এ সভায় প্রবাসীরা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে নানা প্রশ্ন করেন।

জাপানি বিনিয়োগ কাজে লাগাতে প্রস্তুতি বাড়ানোর তাগিদ

বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে জাপানি ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপান সরকার, দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে এ আগ্রহের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে, যাতে আগ্রহকে দ্রুত বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দেওয়া যায়।

তাঁর মতে, বিনিয়োগ বাড়লে দেশে নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। এ ক্ষেত্রে প্রবাসীরা বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক তথ্য তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

সাধারণ মানুষের জন্য সংস্কারই অগ্রাধিকার

সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে তাত্ত্বিক আলোচনা করার চেয়ে খেটে খাওয়া ও প্রান্তিক মানুষের উপকারে আসে—এমন সংস্কার বাস্তবায়ন বেশি জরুরি।

শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষাবর্ষে সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক সচেতনতাবিষয়ক বই অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জটিলতা কমানোই প্রকৃত সংস্কারের অংশ।

পরিবেশ সংরক্ষণে আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ উদ্যোগের লক্ষ্য বায়ুদূষণ কমানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলা।

খাল খনন ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়াকে ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে দেশে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে পানির সংকট মোকাবিলায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খনন কর্মসূচির আদলে কার্যকর উদ্যোগ পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

খাল পুনঃখনন ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

বন্ধ কারখানা চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ

তরুণদের বেকারত্ব কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৫০০টির বেশি বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল-কারখানা পুনরায় চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মধ্যে ৪৬টি বড় রাষ্ট্রীয় কারখানা চালুর প্রক্রিয়া চলছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং দেশের শিল্প খাত ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সংস্কার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী

দেশে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, যেসব সংস্কারে প্রান্তিক মানুষের সরাসরি উপকার হবে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে না দেওয়ার জন্য একটি পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।

প্রবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষ ও তাঁদের সন্তানরা উপকৃত হবেন। তাই রাজনৈতিক দল-মত নির্বিশেষে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলোকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় উপস্থিত প্রবাসীরা করতালি দিয়ে তাঁর বক্তব্যে সমর্থন জানান।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জাতীয় উন্নয়নে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি শিশু যেন ভালো শিক্ষা ও চিকিৎসা পায়, পর্যাপ্ত খাবার পায় এবং বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারে—এমন লক্ষ্য নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। গণতান্ত্রিক, স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসী ও দেশবাসীর সহযোগিতা এবং দোয়া কামনা করেন তিনি।

তারেক রহমানকে সফরসঙ্গী করা নিয়ে সমালোচনার জবাব

অনুষ্ঠানে আমজনতা পার্টির সদস্যসচিব মো. তারেক রহমানকে জাপান সফরের সঙ্গী করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও সমালোচনার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গত দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই তারেক রহমানকে নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। তাঁর কোনো অবদান নেই এবং তাঁকে সফরসঙ্গী করায় সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে—এমন বক্তব্যও দেওয়া হচ্ছে। অথচ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীর সঞ্চালনায় সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ূন কবির, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীরা।

এ ছাড়া জাপান বিএনপির সভাপতি রেজা মীর, সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক মনি, সহসভাপতি মাসুম জাকির, ব্যবসায়ী নেতা কাজী সারওয়ার হাবিব ও দপ্তর সম্পাদক আবুল খায়েরসহ বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সভা শেষে জাপান বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে আলোকচিত্র উপহার দেওয়া হয়।

সর্বশেষ