পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ক্ষেত্রে শুধু নমনীয় বক্তব্য দিয়ে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার ও নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে তোলার পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘জাতীয় পানিসম্পদ সুরক্ষায় পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পদ্মা ব্যারাজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি, তিস্তা নদী সুরক্ষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশি প্রফেশনালস যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।
রিজভী বলেন, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের নদ-নদী ও পরিবেশ মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। অথচ নিজেদের দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পানির ভাগাভাগি নিয়ে ভারতকে আইনি জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তারপরও অন্য দেশের ন্যায্য পানির অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশটি যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, পানির অধিকার আদায়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনেক সময় নমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়। কিন্তু শুধু নরম সুরে কথা বলে কিংবা ছাড় দিয়ে কোনো লাভ হবে না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক আন্দোলন ও কূটনৈতিক তৎপরতা—দুই ক্ষেত্রেই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
১৯৭৭ ও ১৯৯৬ সালের পানি চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির এই নেতা বলেন, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে পানির সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তাসংক্রান্ত ধারা ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে সেটি কেন রাখা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশপ্রেম ও দৃঢ় অবস্থান জরুরি। অন্যথায় পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বাংলাদেশকে বারবার প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
ফারাক্কা ও গজলডোবা দিয়ে উজানের পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহারের অভিযোগ তুলে রিজভী বলেন, এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের নদ-নদীর ওপর পড়ছে। পদ্মা ও তিস্তার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে রিজভী বলেন, বর্ষায় জমা হওয়া পানি শুষ্ক মৌসুমে কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনের প্রয়োজনে ব্যবহার করা সম্ভব। এ জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাবে পদ্মা ও তিস্তার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে রাজশাহী অঞ্চলে গত ২০ থেকে ২৫ বছরে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, নদীর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ জরুরি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষি উৎপাদন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
নদী ব্যবস্থাপনার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে রিজভী প্রকৌশলী বিএম আব্বাসের গবেষণামূলক গ্রন্থ এবং ব্রিটিশ আমলের প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্যের সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতি থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পানি নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী এবং সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

