আন্তর্জাতিক ডেস্ক:নেপালের ভোটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার নেপথ্যে তুষারধস ও নদীর গতিপথে সাময়িক বাধা তৈরি হওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন আবহাওয়া ও ভূতত্ত্ববিদেরা। তাঁদের ধারণা, তুষারধসে পাথর ও বরফের স্তূপে নদীর প্রবাহ আটকে যায়। পরে জমে থাকা পানির চাপ বাড়তে থাকায় সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ হড়পা বান সৃষ্টি হয়।
নেপালের রাসুয়া জেলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভোটেকোশি নদী হিমালয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি নদী। এর প্রধান শাখানদীগুলোর একটি লেহন্দে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, তুষারধসে লেহন্দে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়েছিল। একই সঙ্গে কোনো হিমবাহের বরফগলা পানিতে পূর্ণ হ্রদ ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
বুধবার নেপালের পার্লামেন্টে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খনাল জানান, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের দিকে একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর কয়েক মিনিট পরই তুষারধসের ঘটনা ঘটে। সরকারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে ভোটেকোশিতে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে দুর্যোগের সঠিক কারণ জানতে তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি।
ভয়াবহ এই বন্যায় রাসুয়ার পাশাপাশি নুয়াকোট ও ধাদিং জেলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের মতে, লেহন্দে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ার পর সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে যায়। পানির চাপ একপর্যায়ে পাথরের বাধা ভেঙে দেয় এবং সেই প্রবল স্রোত ভোটেকোশীতে নেমে আসে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, হড়পা বানটি চীন-অধিকৃত তিব্বতের দিক থেকে নেমে আসে। তবে অধ্যাপক কায়স্থের ভাষ্য অনুযায়ী, নেপালের দিক থেকে তুষারধস নেমে সীমান্তবর্তী এলাকায় লেহন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে একই সময় তিব্বত এলাকায় ভূমিকম্পের ঘটনাও ঘটে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল রাসুয়া জেলার গোঁসাইকুণ্ড থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে। ভূমিকম্পের সঙ্গে আকস্মিক বন্যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ভোটেকোশি নদীতে এ ধরনের দুর্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়েও নদীটিতে একই ধরনের হড়পা বান হয়েছিল। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহের হ্রদ ফেটে যাওয়ার কারণে লেহন্দে নদীতে হঠাৎ বিপুল পানির স্রোত নেমেছিল।
এবারের ঘটনায় নিখোঁজ পর্যটকদের একটি অংশ ছিলেন তীর্থযাত্রী। তাঁরা কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ওই অঞ্চলের পথে ছিলেন। সীমান্তবর্তী এই এলাকায় পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত থাকায় আকস্মিক বন্যায় বিপদের মাত্রাও বেড়েছে।
হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাওয়া এবং হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন গবেষকেরা। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় এ ধরনের বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
গবেষণাটি ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রায় ৪০ বছরের উপগ্রহ পর্যবেক্ষণের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সালের তুলনায় ২০০০ সালের পর হিমবাহ গলার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গবেষকদের মতে, গত চার দশকে হিমালয়ের হিমবাহের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ গলে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নির্মাণ, বনভূমি ধ্বংস ও পাহাড়ে অতিরিক্ত অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে বর্ষাকালে হিমালয় অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ফলে ভোটেকোশির এবারের দুর্যোগকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে না দেখে হিমালয়ের সামগ্রিক পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।




