জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। জীবনের শুরুতেই নানা প্রতিবন্ধকতা আর সামাজিক অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনো নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে দেননি নরসিংদীর আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া। পায়ের আঙুলে কলম ধরে লেখাপড়া শিখেছেন, অর্জন করেছেন উচ্চশিক্ষার সনদ। চাকরি না পেয়ে থেমে না গিয়ে নিজেই গড়ে তুলেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান থেকে এখন শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন দেড় শতাধিক শিশুর মাঝে। ব্যতিক্রমী এই জীবনসংগ্রাম ও মানবিক উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দুখু মিয়ার সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন দুই অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তি—বুয়েট থেকে পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ এবং নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাদের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। পাশাপাশি তাদের কাজের প্রশংসা করেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’
শৈশবের কষ্ট পেরিয়ে শিক্ষার পথে যাত্রা
১৯৬২ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন আলতাফ হোসেন। জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকায় তার বাবা-মাকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকেই ভালোবেসে তার নাম রাখা হয় ‘দুখু মিয়া’। তবে জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে আটকে রাখতে পারে না।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তার। কিন্তু হাত না থাকায় সাধারণভাবে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া ছিল কঠিন। প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করাও পরিবারের জন্য সহজ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে ছেলের শিক্ষার আগ্রহকে বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে আসেন তার মা-বাবা।
মা রান্নার পাতিলের তলা থেকে কালি সংগ্রহ করে লেখার উপযোগী করে দিতেন। আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে তৈরি করে দিতেন কলম। সেই কলম পায়ের আঙুলের ফাঁকে ধরে মায়ের তৈরি কালিতে কলাপাতার ওপর লেখার অনুশীলন শুরু করেন দুখু মিয়া। এভাবেই অক্ষরজ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ পেরিয়ে ধীরে ধীরে পড়াশোনার পথে এগিয়ে যান তিনি।
প্রথমে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর চেষ্টা করা হলেও পা দিয়ে আরবি বই স্পর্শ ও লেখার বিষয়টি নিয়ে আপত্তির মুখে পড়তে হয়। পরে গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। নানা ধরনের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য সত্ত্বেও বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা ও নিজের দৃঢ় মনোবল তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহস জোগায়।
পায়ের আঙুলে কলম ধরে লিখেই ১৯৮২ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৪ সালে এইচএসসি পাস করেন দুখু মিয়া। এরপর ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তার এই শিক্ষাজীবন ছিল অসাধারণ অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ডিগ্রি অর্জন করেও মেলেনি চাকরি
উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও জীবিকার জন্য চাকরি পেতে নানা বাধার মুখে পড়তে হয় দুখু মিয়াকে। দুই হাত না থাকায় সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানেই চাকরির সুযোগ পাননি বলে জানান তিনি। পরে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে টিউশনি শুরু করেন। কিন্তু সেই আয় দিয়ে নিজের ও পরিবারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে অন্যের প্রতিষ্ঠানে চাকরির আশায় বসে না থেকে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেন, শিক্ষা অর্জনের সুযোগ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই নিজের পৈতৃক জমিতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে এলাকার শিশুদের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। যে মানুষটি একসময় নিজের কর্মসংস্থানের জন্য নানা বাধার মুখে পড়েছিলেন, তিনিই এখন অন্যদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করছেন।
দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা
বর্তমানে দুখু মিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। সেখানে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের দায়িত্ব পালন করছেন নয়জন শিক্ষক। তবে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করতে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে। শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করতেও অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। কখনো কখনো দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত বেতন দিতে দেরি হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
দুখু মিয়ার স্বপ্ন, তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হবে। এতে এলাকার শিশুরা আরও দীর্ঘ সময় একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পাবে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজন সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক সহযোগিতা।
নিজের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া বলেন, জন্মের পর তার দুই হাত না থাকায় বাবা-মাকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মাদ্রাসায় ভর্তি হতে না পারলেও বাবা-মায়ের উৎসাহে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। মায়ের তৈরি কালি আর বাবার বানানো কলম দিয়ে কলাপাতায় লেখার মধ্য দিয়েই তার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও দুই হাত না থাকার কারণে কোথাও চাকরি পাননি। টিউশনি করে নিজের ও পরিবারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে দুখু মিয়া বলেন, এখন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলছে। প্রতিষ্ঠানটিকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার চেষ্টা করছেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করতে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেন।
দুখু মিয়ার জীবনসংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর এবং অন্যের জীবনে পরিবর্তন আনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নিজের জীবনে শিক্ষার জন্য যে বাধাগুলো অতিক্রম করতে হয়েছে, অন্য শিশুদের যেন সেই বাধার মুখে পড়তে না হয়, সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে তার এই উদ্যোগ আরও পরিচিতি পেয়েছে। এখন তার প্রত্যাশা, বিদ্যালয়টির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া গেলে আরও বেশি শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরি হবে এবং তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।

