সরকারি চাকরিতে ৫ লাখের বেশি পদ শূন্য, নিয়োগের গতি নিয়ে প্রশ্ন

অনুমোদিত পদের ২৬.২৯ শতাংশ খালি; প্রথম ১৮০ দিনে ২ হাজার ৮৭৯টি পদ পূরণের লক্ষ্যের বিপরীতে নিয়োগ হয়েছে ২ হাজার ৬১ জনের

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

দেশের সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ শূন্য রয়েছে, যা মোট অনুমোদিত পদের ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১০০টি পদের মধ্যে ২৬টির বেশি পদে জনবল নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন।

- Advertisement -

বুধবার জাতীয় সংসদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যপত্রের সঙ্গে দেওয়া মন্ত্রণালয়ের এক নথিতে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে শূন্যপদ পূরণে সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে কোন মন্ত্রণালয়ে কত পদ পূরণ করা হবে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার নির্দিষ্ট সময়সীমা কী, তা বিস্তারিত জানানো হয়নি।

প্রথম ১৮০ দিনে লক্ষ্যের চেয়ে কম নিয়োগ

নথি অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে ২ হাজার ৮৭৯টি শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৬১ জনকে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮১৮টি পদ কম পূরণ হয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও তাঁদের অধীন কার্যালয়গুলোতে অনুমোদিত ৪১ হাজার ৭৫৫টি পদের মধ্যে ২৭ হাজার ১৭৭ জন কর্মরত। শূন্য রয়েছে ১৪ হাজার ৫৭৮টি পদ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ৬২৯টি পদের মধ্যে ৫০৫ জন কর্মরত এবং ১২৪টি পদ খালি।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের জনবলকাঠামো হালনাগাদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অন্যতম দায়িত্ব। জনবলের তথ্য সংরক্ষণ ও হালনাগাদে সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ব্যবহারের কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি নিয়ে আলোচনা

কমিটির বৈঠকে শূন্যপদ দ্রুত পূরণের পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। কমিটির সদস্য রেহেনা আক্তার রানু বলেন, ২০২৩ সালে শুরু হওয়া কয়েকটি উন্নয়নকাজ ও সার্কিট হাউসের প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি ১৫ শতাংশ, আবার কোনোটি মাত্র ৭ শতাংশ।

তাঁর মতে, প্রকল্পের এমন ধীরগতি প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশিত কাজের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বৈঠকে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছে কমিটি।

বিশেষ বিসিএসে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

বৈঠকে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের বিষয়টিও উঠে আসে। সূত্র জানায়, জামায়াতের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল মেধাতালিকায় ১১৯তম অবস্থানে থাকা এক প্রার্থীকে শিবিরসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রথমে নিয়োগ না দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। কেন এবং কোন মানদণ্ডে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তা জানতে চান তিনি।

প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি-সংশ্লিষ্ট বিষয় বিবেচনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে কমিটির বৈঠকে তথ্য উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়। তবে আগামী বৈঠকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।

কমিটির সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিসিএসে নিয়োগের সময় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়, তা জানতে চেয়েছেন জামায়াতের সংসদ সদস্য। তবে তাঁর অভিযোগের ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন ফখর উদ্দিন আহমেদ।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারের প্রবেশ পদে ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পিএসসির সুপারিশ পাওয়া ৬৬৮ জনের মধ্যে ৫৭ জনের নাম ওই প্রজ্ঞাপনে ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাঁদের মধ্যে তিনজন প্রয়োজনীয় সনদ জমা দেননি এবং আটজন স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উপস্থিত হননি। বিতর্কের পর ৫ অক্টোবর ৪৬ জনের মধ্যে ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

সরকারি কাজে অসহযোগিতা শনাক্তের সুপারিশ

বৈঠকে সরকারি কাজে অসহযোগিতা বা অবহেলাকারীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে সরকারি কাজে ক্ষতিকর ভূমিকা না থাকলে শুধু দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয় বলে মত দেন আলোচনায় অংশ নেওয়া সদস্যরা। ওএসডি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও তাঁদের ভূমিকা ও অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উঠে আসে।

সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে কমিটির সভাপতি সাঈদ আহমেদ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আইনগত, প্রশাসনিক বা বাস্তব কোনো বাধা থাকলে তা স্পষ্টভাবে কমিটির সামনে তুলে ধরার নির্দেশনা দেন। প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি গোপন না করে উপস্থাপন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

সাঈদ আহমেদ বলেন, সমস্যা সমাধানে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নন। কমিটিকে প্রতিপক্ষ না ভেবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বৈঠকে ‘সবার ওপরে বাংলাদেশ’ নীতি বাস্তবায়নে সরকারি কাজে অসহযোগিতা বা অবহেলাকারীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি ধীরগতির প্রকল্পগুলোর কারণ অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়।

সর্বশেষ