সৌদিগামী ১৫ হাজার যাত্রীর ভোগান্তি, চাকরি হারানোর শঙ্কায় প্রবাসী কর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

ঢাকা থেকে ১০০টি ফ্লাইট স্থগিত; কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হচ্ছে, কারও ছুটি ফুরিয়ে যাচ্ছে—জেদ্দা ও মদিনা হয়ে পাঠানোর চেষ্টা, কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার

- Advertisement -

সৌদি আরবে কর্মস্থলে যোগ দেওয়া কিংবা ছুটি শেষে কাজে ফেরার অপেক্ষায় থাকা হাজারো বাংলাদেশি কর্মী অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ঢাকা থেকে ১০০টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৫ হাজারের বেশি যাত্রী, যাঁদের বড় একটি অংশ প্রবাসী কর্মী। তাঁদের কারও ভিসার মেয়াদ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হবে, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে জেদ্দা ও মদিনাগামী ফ্লাইটের মাধ্যমে কর্মীদের সৌদি আরবে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ভিসা, কর্মসংস্থান ও যাত্রাসংক্রান্ত জটিলতা কমাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে সরকার।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বুধবার (১৪ অক্টোবর) এক বার্তায় জানায়, স্থগিত বা বাতিল হওয়া ১০০টি ফ্লাইটের মধ্যে ৪১টি সরাসরি এবং ৫৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ ও ঢাকা-দাম্মাম রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও ঢাকা-রিয়াদ রুটে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

ভিসার মেয়াদ শেষ, আটকে আছে যাত্রা

সৌদি আরবের দাম্মামে যাওয়ার কথা ছিল হৃদয়ের। কিন্তু ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় তাঁর যাত্রা আটকে গেছে। আগামী ১৭ অক্টোবর তাঁর ভিসার মেয়াদ শেষ হবে। মঙ্গলবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্যালয়ে বিকল্প ফ্লাইটের খোঁজ নিতে দেখা যায় তাঁকে।

একই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মোহাম্মদ নাসির। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে তাঁর রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর ভিসার মেয়াদ ২০ অক্টোবর শেষ হলেও রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত রাখা হয়েছে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত। বিমানবন্দরের কাউন্টারে যোগাযোগ করলে তাঁকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। আসন খালি পাওয়া গেলে অন্য ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

মোহাম্মদ রুহুল আমিনের ১১ অক্টোবর রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল। পরে তাঁর রিক্রুটিং এজেন্সি বিকল্প হিসেবে জেদ্দার টিকিটের ব্যবস্থা করে। আরেক কর্মী মোহাম্মদ রেজাউল করিমকে আরও দু-এক দিন অপেক্ষা করতে বলেছে তাঁর এজেন্সি। এ সময়ের মধ্যে সৌদিগামী অন্য ফ্লাইটে আসন পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

তবে সবার পরিস্থিতি এক নয়। মোহাম্মদ শাহিনের ভিসার মেয়াদ কয়েক মাস থাকায় তিনি ছুটির সময় এক মাস বাড়িয়ে নিয়েছেন। প্রয়োজনে জেদ্দা কিংবা মদিনা হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

বিকল্প ফ্লাইট খুঁজতে হিমশিম এজেন্সিগুলো

ফ্লাইট সংকটের মধ্যে কর্মীদের ভিসা ও চাকরি রক্ষায় বিকল্প পথ খুঁজছেন রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিরা। কিন্তু বিকল্প রুটে টিকিট পাওয়া, যাত্রার সময় সমন্বয় করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মীদের কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এমআরজে গ্লোবালের বেলাল হোসেন জানান, কর্মীদের ভিসা ও চাকরি রক্ষায় বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। এ জন্য সচল বিমানবন্দর ও বিকল্প রুটের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

উদয়ন ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস এবং জিএম ওভারসিজের প্রতিনিধিরা কর্মীদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, ভিসার মেয়াদ শেষ হলে তা নবায়ন করা কঠিন হতে পারে। ফলে ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা এখন শুধু যাত্রা পিছিয়ে যাওয়ার সমস্যা নয়; অনেকের জন্য এটি বিদেশে চাকরি ধরে রাখার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেদ্দা-মদিনা হয়ে যাওয়ার পরামর্শ

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, জরুরি প্রয়োজনে সৌদি আরবে যেতে হলে যাত্রীরা জেদ্দা বা মদিনাগামী ফ্লাইটের বিকল্প বিবেচনা করতে পারেন। এ বিষয়ে জানতে বিমানের বিক্রয়কেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তবে বিকল্প রুটে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের সময়সূচি, টিকিটের প্রাপ্যতা এবং সৌদি আরবে প্রবেশের প্রয়োজনীয় শর্ত যাচাই করা জরুরি। বিকল্প ফ্লাইট পাওয়া গেলেই যে সব কর্মী সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।

যাত্রীদের তথ্য দিতে এয়ারলাইনসকে নির্দেশ

ফ্লাইট বাতিল ও সময় পরিবর্তনের কারণে যাত্রীদের অনিশ্চয়তা কমাতে গত ১২ অক্টোবর বেবিচক সৌদিগামী এয়ারলাইনসগুলোকে নির্দেশনা দেয়। ফ্লাইটের পরিবর্তিত সময়সূচি বা বাতিলের তথ্য এসএমএস, ফোনকল কিংবা ইমেইলের মাধ্যমে দ্রুত জানাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি টিকিটের অর্থ ফেরত, বিকল্প ফ্লাইটে আসন এবং নতুন যাত্রার সময় সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।

ভিসা ও ইমিগ্রেশনসংক্রান্ত জটিলতায় পড়া যাত্রীদের সহায়তা এবং বিমানবন্দরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে এয়ারলাইনসগুলোকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নতুন সময়সূচি যাত্রীদের জানানো হবে।

চাকরি ও জীবিকা রক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা

ফ্লাইট সংকটে আটকে পড়া কর্মীদের পরিস্থিতি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। বিশেষ করে যাঁদের ছুটি শেষ হয়ে আসছে কিংবা ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে, তাঁদের সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে চেষ্টা চলছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। কর্মীদের চাকরি ও জীবিকার ঝুঁকি কমাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। কোনো কর্মীকে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরতে হলে তাঁর পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

বিকল্প শ্রমবাজারের প্রয়োজনীয়তা

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। দেশটিতে বিমান চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে নতুন কর্মী পাঠানো, ছুটি শেষে কর্মীদের কাজে ফেরা এবং প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এ সংকটের কারণে কর্মসংস্থান বা রেমিট্যান্সে সামগ্রিক প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির স্থায়িত্ব ও বিকল্প ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।

প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জনশক্তি রপ্তানির পরিকল্পনা কিছুটা ধীর হতে পারে। এ কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক ও ইউরোপের দেশগুলোতে বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজা এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, শুধু নতুন দেশে অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে এ ধরনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরি এবং আগামী এক থেকে দুই বছরের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তবে হৃদয় ও নাসিরের মতো কর্মীদের কাছে এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে জরুরি হলো ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সৌদি আরবে পৌঁছানো। তাঁদের মতো হাজারো কর্মীর চাকরি ও জীবিকা নির্ভর করছে বিকল্প ফ্লাইটে আসন পাওয়া, নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিমান চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।

সর্বশেষ