বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন অধ্যায়, ৭০ বছর পর চালু নৌপথ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

দীর্ঘ সাত দশক পর ভারতের আসাম থেকে নদীপথে সরাসরি বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। দেশভাগের পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ঐতিহাসিক নৌবাণিজ্যপথ আবার সচল হওয়ার মধ্য দিয়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে বিকল্প রুট হিসেবেও এ নৌপথের কার্যকারিতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

- Advertisement -

গত ৫ অক্টোবর আসামের ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করে পণ্যবাহী বার্জ ‘ডিএলবি পাটকাই’। আসাম সরকারের প্রতিষ্ঠান আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডের নামরূপ কারখানায় উৎপাদিত মিথানল নিয়ে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। বার্জটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ‘কুশল কোঁয়র’ নামের একটি টাগবোট।

ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয় এই যাত্রাকে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র নদকে ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হবে।

ব্রহ্মপুত্র হয়ে বাংলাদেশে পণ্য পরিবহন

পরিকল্পনা অনুযায়ী, পণ্যবাহী জাহাজটি ভারতের জাতীয় নৌপথ-২ ধরে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার অতিক্রম করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর দুই দেশের মধ্যে নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ নৌ ট্রানজিট ও বাণিজ্য প্রটোকল রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতরে যাত্রা অব্যাহত রাখবে।

বগিবিল থেকে বাংলাদেশের পানগাঁও পর্যন্ত নৌপথের মোট দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষ আসামের সাদিয়া থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে জাতীয় নৌপথ-২ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এই নৌপথের বাণিজ্যিক কার্যকারিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পণ্য পৌঁছাতে কত সময় লাগে, পরিবহন ব্যয় কত হয় এবং বন্দরগুলোতে পণ্য ওঠানো-নামানোর প্রক্রিয়া কতটা সহজ—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দেশভাগে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল নদীবাণিজ্য

আসামের ডিব্রুগড় একসময় নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ব্রহ্মপুত্রের ঘাট দিয়ে বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি চা বাণিজ্যেও নদীপথের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রেলপথের ব্যবহার বাড়ায় নদীপথের গুরুত্ব কমতে থাকে। একপর্যায়ে ১৯৫৬ সালে ডিব্রুগড়ের পুরোনো নদীঘাট বন্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘ বিরতির পর এবার ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক পণ্য পাঠানোর উদ্যোগ সেই পুরোনো যোগাযোগব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নিয়মিত নৌপরিবহন চালু করা গেলে আসামের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশের বাজারে পণ্য পাঠানোর নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য বিকল্প বাণিজ্যপথ

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগে শিলিগুড়ি করিডোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করা গেলে পণ্য পরিবহনে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে।

বাংলাদেশের নদীপথগুলো ব্রহ্মপুত্রকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নৌবন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে নির্ধারিত প্রটোকল রুট ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হলে পরিবহনব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আসতে পারে। এতে সময় ও খরচ কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে, যদিও প্রকৃত সাশ্রয় নির্ভর করবে পরিবহন সময়, নৌযানের সক্ষমতা, বন্দরসেবা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের ওপর।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এ উদ্যোগকে রাজ্যের জন্য গর্বের বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নামরূপে উৎপাদিত পণ্য নদীপথে সরাসরি বাংলাদেশের দিকে পাঠানোর ঘটনাকে তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্য সম্প্রসারণের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

আগেও ব্যবহার হয়েছে বাংলাদেশের নৌপথ

ভারত ও বাংলাদেশের নদীপথ ব্যবহার করে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের নজির আগে থেকেই রয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জলপথ অতিক্রম করে টাটা স্টিলের পণ্যবাহী বার্জ ভারতের পান্ডুতে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালে বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় যাওয়ার পথে পর্যটকবাহী ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ও বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রম করে।

তবে এবারের উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, আসামে উৎপাদিত বাণিজ্যিক পণ্য সরাসরি বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠানো হচ্ছে। ফলে এটি শুধু নৌযোগাযোগের ঘটনা নয়, বরং আসামের শিল্প উৎপাদন ও বাংলাদেশের বাজারের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ।

নিয়মিত সেবা চালুই হবে মূল পরীক্ষা

একটি চালানের মাধ্যমে নৌপথটির দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সাফল্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ রুট কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নিয়মিত পণ্য পরিবহন, নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো, শুল্ক ও খালাস প্রক্রিয়ার সহজতা এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর।

ফিরতি পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে নৌযানের ব্যবহার আরও কার্যকর হতে পারে। এতে একমুখী পরিবহনের ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও থাকবে।

সব মিলিয়ে, ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে মিথানলবাহী বার্জের যাত্রা দুই দেশের নৌবাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। এখন দেখার বিষয়, ঐতিহাসিক এই উদ্যোগ কত দ্রুত নিয়মিত ও লাভজনক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়। তা সম্ভব হলে ব্রহ্মপুত্র আসামের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশের বাজারের মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সর্বশেষ