রাজধানীর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অভিযানের ভিডিও প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের নিয়ম এবং জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি অভিযানে অংশ নেওয়ার এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া থানার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের রেললাইনসংলগ্ন একটি বস্তিতে আকস্মিক অভিযান চালান ইশরাক হোসেন। এ সময় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গাড়ি থেকে নেমে তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের ধরার নির্দেশ দেন। ভিডিওতে পাশ থেকে একজনকে ‘একেবারে গুলি করে দেব’ বলতেও শোনা যায়। এ সময় প্রতিমন্ত্রীর দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে আটক করার চেষ্টা করেন। তাঁদের একজনকে এক দেহরক্ষী লাথি মারেন বলেও ভিডিওতে দেখা যায়।
অভিযান শেষে ছয়জনকে আটক করে থানায় নেওয়ার বিষয়ে পুলিশকে জানান প্রতিমন্ত্রী। গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির জানান, ইশরাক হোসেনের ফোন পাওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে আটক ব্যক্তিদের থানায় নিয়ে আসেন। তাঁদের কাছ থেকে সাদা পাউডারজাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে। তবে সেগুলো হেরোইন কি না, তা পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
অভিযানে প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা অস্ত্রটির লাইসেন্স আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁর এপিএস আরিফুল ইসলাম দাবি করেন, প্রতিমন্ত্রী পিস্তল নয়, লাঠি নিয়ে অভিযানে গিয়েছিলেন।
তবে ভিডিওতে আগ্নেয়াস্ত্রের মতো বস্তু দেখা যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বৈধ অস্ত্র থাকলেও তা প্রকাশ্যে এভাবে প্রদর্শন করা যায় কি না, সে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
আইনজ্ঞদের মতে, একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী সরকারের নীতিনির্ধারণী ও নির্বাহী দায়িত্ব পালন করলেও সরাসরি অভিযান পরিচালনা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা তাঁর নেই। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহারসংক্রান্ত নীতিমালায় আত্মরক্ষার বাইরে অস্ত্র প্রদর্শন করে অন্যকে ভয় দেখানো বা হয়রানি করার সুযোগ নেই।
উচ্চ আদালতের আইনজীবী তাওহীদুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা-২০২৫-এর ২৫(ক) ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্সধারী ব্যক্তি আত্মরক্ষার প্রয়োজনে অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করতে পারেন। অন্যের মধ্যে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ২১ ধারায় লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদাও এ ধরনের অভিযানে ব্যক্তিগত অস্ত্র প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, বৈধ অস্ত্র মূলত আত্মরক্ষার প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। একজন প্রতিমন্ত্রীর নিরাপত্তায় পুলিশ থাকার কথা, তাই সরাসরি অভিযানে তাঁর নিজের অস্ত্র প্রদর্শন না করাই ভালো।
এদিকে অভিযানের ভিডিওতে নিজের অবস্থান তুলে ধরে ইশরাক হোসেন বলেছেন, ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে। মাদক কারবারে যে দলের লোকই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেন তিনি। এমনকি নিজ দলের কেউ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।
এলাকাবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো স্থান থাকবে না। ঢাকা-৬ আসন থেকে শুরু হওয়া এ অভিযান সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে এবং দেশের কোথাও মাদকের জায়গা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ কাজে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতাও কামনা করেন প্রতিমন্ত্রী।
ঘটনা সম্পর্কে বক্তব্য জানতে ইশরাক হোসেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত সময় পর্যন্ত তিনি সাড়া দেননি।
মাদকবিরোধী অভিযানে ছয়জনকে আটক করার ঘটনাটি একদিকে যেমন আলোচনায় এসেছে, অন্যদিকে অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা ও জনপ্রতিনিধিদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এনেছে।

