ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংকটে ইউরোপে বাড়ছে উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ দেশটির ভেতরে জমে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপকে নতুন করে সামনে এনেছে। বড় বাজেট ঘাটতি, দ্রুত বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকারের জন্য আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

- Advertisement -

ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটির পরিস্থিতি এখন শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছেন না বিনিয়োগকারীরা। ফরাসি সরকারি বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি এবং জার্মান বন্ডের সঙ্গে সুদহারের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের আর্থিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঋণ ছাড়িয়েছে অর্থনীতির আকার

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ইতোমধ্যে দেশটির অর্থনীতির মোট আকারকে ছাড়িয়ে গেছে। জুন মাসে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ছিল। এর ওপর বন্ডের সুদহার বাড়তে থাকায় ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও বেড়েছে।

সরকারের ব্যয়ের চাপও কমছে না। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় পেনশন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সময়ে ইউরোপের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা খাতেও রয়েছে বাড়তি ব্যয়ের দাবি। শিক্ষকস্বল্পতা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত চাপ এবং পুরোনো স্কুল অবকাঠামোর সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সরকারের ওপর সামাজিক ব্যয়ের চাপ আরও বাড়িয়েছে।

অর্থাৎ একদিকে বাজেট ঘাটতি কমানোর জন্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন, অন্যদিকে নাগরিকদের বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবি—এই দুই বিপরীত চাপের মধ্যে রয়েছে ফরাসি সরকার।

ঘাটতি কমানোর পদক্ষেপেই বাড়ছে অসন্তোষ

ফ্রান্সে সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নতুন নয়। অতীতে এ ধরনের পদক্ষেপ বড় ধরনের জনঅসন্তোষ তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল।

এবারও বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচন ও কর বাড়ানোর পরিকল্পনা সামনে এনেছে সরকার। কিন্তু আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থাকায় রাজনৈতিকভাবে কঠিন এসব সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে বাজারে সংশয় রয়েছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু কেনিংহ্যামের আশঙ্কা, নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আইনপ্রণেতারা সরকারের আর্থিক সংস্কারের প্রস্তাবকে দুর্বল করে দিতে পারেন। তাতে ঘাটতি কমানোর পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে।

নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা

ফ্রান্সের অর্থনীতির সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশটির অর্থনৈতিক নীতি কোন পথে যাবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের কেনিংহ্যামের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সরকার আর্থিক নীতিতে আরও জনতুষ্টিবাদী অবস্থান নিতে পারে। এতে সরকারি বন্ডের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি অবশ্য সরকারি অর্থব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে বড় ধরনের ব্যয় কমানোর কথা বলছে। একই সঙ্গে দলটি কর কমানোর অবস্থানও ধরে রেখেছে। ফলে তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বন্ডবাজারে বাড়ছে চাপ

ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সরকারি বন্ডবাজারে। বিনিয়োগকারীরা ফরাসি বন্ড বিক্রি বাড়িয়ে দেওয়ায় এর দাম কমেছে এবং সুদহার বেড়েছে।

সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার প্রায় ৭০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। একই সময়ে জার্মানির তুলনায় ফরাসি বন্ডের সুদহারের ব্যবধানও ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি চলে যায়।

অক্টোবরে এই ব্যবধান প্রায় ১৬০ বেসিস পয়েন্টে পৌঁছেছিল বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সহজ ভাষায়, বিনিয়োগকারীরা এখন জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সের ঋণকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। তাই ফরাসি সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বাড়তি সুদ দিতে হচ্ছে।

সংকট ছড়াতে পারে অন্য দেশেও

ফ্রান্সের অর্থনীতি ও সরকারি ঋণবাজারের আকার এত বড় যে দেশটির আর্থিক সমস্যাকে শুধু জাতীয় সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ কম। ফরাসি বন্ডে ঝুঁকি বাড়লে ইউরোপের অন্যান্য উচ্চঋণগ্রস্ত দেশের বন্ডেও বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যাঞ্জেল তালাভেরার মতে, ইউরোপীয় অর্থনীতিতে ফ্রান্সের গুরুত্বের কারণে দেশটির সংকট অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখনো ২০১০-এর দশকের গোড়ার দিকে গ্রিস ও ইতালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া ইউরোজোন ঋণসংকটের পর্যায়ে পৌঁছেনি। তারপরও বড় অর্থনীতির কোনো দেশের ঋণবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ইউরোপের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইউরোতেও চাপ

ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের প্রভাব ইউরোর বাজারেও দেখা গেছে। গত সোমবার ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর ২০২৫ সালের মে মাসের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায় এবং সাময়িকভাবে ১ দশমিক ১২ ডলারের নিচে চলে যায়।

বুধবারও ইউরো ১৭ মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ের দিকে ছিল। একই সময়ে ফরাসি ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহারও দ্রুত বেড়েছে।

বাজারের আশঙ্কা, ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ইউরোজোনের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে।

ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারেও ঝুঁকি

ফ্রান্সের এই সংকট এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইউরোপের অর্থনীতি দীর্ঘ মন্দাভাব কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ, ইউরোপীয় পণ্যের চাহিদা এবং জার্মানিতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি এনেছে।

সাম্প্রতিক জরিপেও ইউরো অঞ্চলের উৎপাদন ও সেবা খাতে কার্যক্রম প্রায় সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দ্রুততম গতিতে বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মরগ্যান স্ট্যানলির অর্থনীতিবিদেরা সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বলেছিলেন, ইউরোপের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাচ্ছে এবং প্রত্যাশার তুলনায় অঞ্চলটি বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে।

তবে এই পুনরুদ্ধারের পথে উচ্চ সরকারি বন্ডের সুদহার বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ঋণের খরচ বাড়লে চাপ পড়বে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়

সরকারি বন্ডের সুদহার বাড়ার প্রভাব শুধু সরকারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ঋণের খরচও বাড়তে পারে।

নেদারল্যান্ডসের ব্যাংক আইএনজির ম্যাক্রোইকোনমিকস বিভাগের প্রধান কার্স্টেন ব্রজেস্কির মতে, সরকারগুলো ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সুদের হার আরও বাড়তে পারে।

উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বেড়ে যায়। বাড়ি বা গাড়ি কেনার ঋণ ব্যয়বহুল হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগও কমে যেতে পারে।

সরকারের ক্ষেত্রেও নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে। ফলে ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে অন্য খাতে ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হয়। আর অতিরিক্ত ব্যয় সংকোচন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ধীর করে দিতে পারে।

ফ্রান্সের সামনে কঠিন সমীকরণ

ফ্রান্স এখন এমন এক অর্থনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি, যার সহজ সমাধান নেই। বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় কমানো প্রয়োজন, কিন্তু ব্যয় কমালেই সামাজিক অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মসূচি।

এরই মধ্যে বাজার ফ্রান্সের ঋণের জন্য বাড়তি ঝুঁকি-প্রিমিয়াম দাবি করছে। বুধবার দেশটির ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উঠে যায়।

ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এম্যানুয়েল মুলাঁ অবশ্য জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার প্রয়োজন নেই। তার মতে, সমস্যার সমাধান ফ্রান্সের নিজস্ব আর্থিক নীতির মধ্যেই খুঁজতে হবে।

সব মিলিয়ে ফ্রান্সের বর্তমান সংকট এখন আর কেবল একটি দেশের বাজেট ঘাটতি বা রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয় নয়। দেশটির ঋণবাজারে দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হলে তা ইউরোপের বন্ডবাজার, ইউরোর বিনিময়মূল্য এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার—তিন ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ফ্রান্স আগামী দিনে আর্থিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করে, সেটিই এখন ইউরোপের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সর্বশেষ