সাধারণের জন্য টিকিট ছাড়ার আগেই ব্লক, রেলের ই-টিকিটিংয়ে ১৬৯ অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের সন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরুর আগেই অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে আসন ব্লক করার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিটিং ব্যবস্থায়। এতে সাধারণ যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত টিকিট আগাম আটকে রেখে পরে বুকিং দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রেলওয়ের সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থা বিআরআইটিএসের ওপর পরিচালিত আইটি অডিটে এমন নিয়ন্ত্রণগত দুর্বলতা উঠে এসেছে। অডিটে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজ লিমিটেডের কর্মীদের পরিচালনায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের তথ্যও পাওয়া গেছে।

- Advertisement -

পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় শুধু টিকিট ব্লক করার সুযোগ নয়, যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, টিকিট বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন নিয়েও একাধিক অনিয়ম ও ঝুঁকির বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে সিস্টেম দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকায় সহজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় না করার বিষয়টিও রয়েছে।

২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিআরআইটিএসের কার্যক্রম নিয়ে করা এই অডিটের ২২টি মেমো গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে পরিবহন অডিট অধিদপ্তর। গত ১৬ আগস্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়।

টিকিট বিক্রির আগেই আসন ব্লক

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআরআইটিএসের অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে সাধারণ যাত্রীদের জন্য অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েক দিন আগেই নির্দিষ্ট আসন ‘Open For All’ কোটা থেকে ‘Only For Offline’ কোটায় সরিয়ে ব্লক করে রাখা সম্ভব। চট্টগ্রাম ও সিলেট স্টেশনে পরীক্ষা চালিয়ে এ ধরনের ব্যবস্থার প্রমাণ পেয়েছে অডিট দল।

চট্টগ্রাম স্টেশনের অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ডে চলতি বছরের ২৭ জুলাই পরীক্ষা করে দেখা যায়, কক্সবাজার-ঢাকা রুটের পর্যটক এক্সপ্রেসের ১১ আগস্টের একটি আসন সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত কোটা থেকে সরিয়ে শুধু অফলাইনে বিক্রির কোটায় রাখা হয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, ওই যাত্রার টিকিট ১ আগস্ট সকাল ৮টায় অনলাইনে ছাড়ার কথা ছিল।

অডিট দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, টিকিট বিক্রি শুরুর আগে আসন ব্লক করার এই সুযোগ অপব্যবহার করা হলে সাধারণ যাত্রীরা অনলাইনে টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত হতে পারেন।

সিলেট স্টেশনে পুনরায় পরীক্ষা চালিয়ে অডিট দল জানায়, টিকিট ছাড়ার এক থেকে দুই মিনিট আগে কোনো ভেন্ডর প্রতিনিধি আসন অফলাইন কোটায় সরিয়ে নিলে পরবর্তী তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে বুকিং সহকারীদের মাধ্যমে একাধিক টিকিট বুক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ সময় অনলাইনে টিকিটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা সংশ্লিষ্ট আসনগুলো বুকড বা বিক্রি হয়ে গেছে বলে দেখতে পারেন।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেন্ডর প্রতিনিধি ও বুকিং সহকারীদের যোগসাজশে এ ধরনের সুযোগ ব্যবহার করে বিভিন্ন রুটের টিকিট কালোবাজারির ঝুঁকি রয়েছে। তবে এই সুযোগ থাকার অর্থ সব অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কালোবাজারিতে জড়িত—এমন প্রমাণ নয়।

১৬৯ অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট নিয়ে প্রশ্ন

অডিটে সহজের কর্মীদের পরিচালনায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কোটা সমন্বয়, আসন ব্লক ও উন্মুক্ত করা, কাউন্টার তৈরি এবং টিকিট হস্তান্তরের মতো কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য উঠে এসেছে।

চুক্তি অনুযায়ী, সহজের কর্মীদের দায়িত্ব সিস্টেমের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ করা। টিকিট বিক্রি, কোটা সমন্বয় কিংবা আসন ব্লক ও উন্মুক্ত করার মতো কার্যক্রমে তাঁদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়।

অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে, বিআরআইটিএস চালুর পর প্রায় ১৬৩টি স্টেশনে ভেন্ডরের কর্মীদের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও রেল কর্তৃপক্ষ কোনো জরিমানা করেনি। চুক্তিতে এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার জন্য ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও একটি দুর্বলতা হলো, অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ডে কার্যক্রমের বিস্তারিত অ্যাকটিভিটি লগ বা অডিট লগ দেখার সুযোগ নেই। ফলে কে, কখন এবং কী উদ্দেশ্যে আসন বা কোটা পরিবর্তন করেছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। অডিটের মতে, এতে অনিয়ম প্রতিরোধ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

টিকিট বিক্রির সময় নিয়ে যাত্রীর অভিযোগ

টিকিট বিক্রির নির্ধারিত সময়ের আগেই বুকিং হয়ে যাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। শামিম রানা শামু নামের এক যাত্রী গত ১০ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, সকাল ৮টায় টিকিট বিক্রি শুরুর কথা থাকলেও ৭টা ৫৯ মিনিটেই ৩৫ জনকে টিকিট বুকিং দিতে দেখা যায়। তখন অনলাইনে অপেক্ষায় ছিলেন ৫২৪ জন সক্রিয় ব্যবহারকারী।

ওই যাত্রীর সন্দেহ, আগাম বুকিং দেওয়া অ্যাকাউন্টগুলো অ্যাডমিনের হতে পারে। তাঁর দাবি, সকাল ৮টা ১ মিনিটের মধ্যে ওই ট্রেনের সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। সাধারণ যাত্রীর ক্ষেত্রে টিকিট বুকিং ও বিকাশে মূল্য পরিশোধ করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এই অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে নেই।

রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যাত্রার ১০ দিন আগে সকাল ৮টায় অনলাইন ও কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। তবে টিকিট বিক্রির প্রায় পাঁচ দিন আগেই সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট ট্রেনের তথ্য প্রস্তুত রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য আগাম টিকিট বিক্রি নয়; বরং বিক্রি শুরুর আগে সময়সূচি, স্টেশন, আসনবিন্যাস ও কোটা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা সংশোধন করা।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, টিকিট বিক্রি শুরুর দিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত কোনো ব্যবহারকারী আসন বা কোটা স্থানান্তর করতে পারেন না। টিকিট বিক্রি নির্বিঘ্ন রাখতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাত্রীদের জন্য টিকিট আটকে রাখার উদ্দেশ্যে নয়।

যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়েও ঝুঁকি

অডিটে বিআরআইটিএসের ডেটাবেইস সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল ডেটাবেইস আমাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) সিঙ্গাপুর অঞ্চলের ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে সংরক্ষিত রয়েছে। সাইবার হামলা বা নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে যাত্রীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে যাত্রীদের নাম, মোবাইল ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, ভ্রমণের ইতিহাস এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য। এসব তথ্য চুরি হলে পরিচয় জালিয়াতি, প্রতারণা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা রয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে ডেটাবেইস থেকে তথ্য চুরির কোনো নিশ্চিত ঘটনার কথা বলা হয়নি; বিষয়টি সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

জরিমানা আদায় ও রাজস্ব জমা নিয়েও প্রশ্ন

অডিট প্রতিবেদনে অনলাইন টিকিট বিক্রির আয় এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের হিসাবেও অসংগতি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি টিকিটিং সিস্টেম দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকায় সহজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় না করার বিষয়টি উঠে এসেছে।

এসব পর্যবেক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, তাঁরা অডিট প্রতিবেদন পেয়েছেন এবং বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। প্রতিটি পর্যবেক্ষণের যথার্থতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় জবাব দেওয়া হবে। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

আগাম টিকিট বুকিংয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, প্রয়োজনে অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টগুলো রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে। জরিমানার অর্থের ক্ষেত্রে রেলওয়ে ও সহজের মধ্যে পাওনা-দেনা সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অডিটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ই-টিকিটিং ব্যবস্থায় যাত্রীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, প্রতিটি কার্যক্রমের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন এবং রাজস্বের হিসাব যাচাই জরুরি। এসব দুর্বলতা দূর করা না গেলে অনলাইন টিকিট বিক্রির স্বচ্ছতা ও যাত্রীদের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যেতে পারে।

সর্বশেষ