১০০ গ্রাম প্লাস্টিক দিলেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় বিনা মূল্যে প্রবেশ

চার শতাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারে ইপসার সঙ্গে জেলা প্রশাসনের চুক্তি

মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম:
spot_img

মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম: পরিবেশদূষণ রোধে শিশু-কিশোরদের সচেতন করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। ব্যবহৃত ১০০ গ্রাম প্লাস্টিক জমা দিলেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় বিনা মূল্যে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা। গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া এ কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে চার শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। এবার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক নিয়মিতভাবে পুনর্ব্যবহারের আওতায় আনতে ইপসা ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে জেলা প্রশাসন।

- Advertisement -

সোমবার (২৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, প্লাস্টিক সংগ্রহে মানুষের আগ্রহকে কাজে লাগাতে পারলে দেশে পুনর্ব্যবহারভিত্তিক একটি বড় শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় সাধারণ প্রবেশমূল্য ৭০ টাকা। তবে ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা ১০০ গ্রাম ব্যবহৃত প্লাস্টিক জমা দিয়ে বিনা মূল্যে প্রবেশ করতে পারছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু প্লাস্টিক সংগ্রহ নয়, বরং শিশু-কিশোরদের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ববোধ তৈরি করা।

জেলা প্রশাসক বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে চিড়িয়াখানার প্রবেশমূল্য দেওয়া সম্ভব হলেও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে নিয়ে আসার অভিজ্ঞতা তাদের পরিবেশদূষণের ক্ষতিকর দিক নিয়ে ভাবতে শেখাবে। উদ্যোগটির পরিসর ছোট হলেও এর সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

সংগৃহীত প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের দায়িত্বে ইপসা

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, চিড়িয়াখানায় জমা হওয়া প্লাস্টিক নিয়মিত সংগ্রহ, পৃথকীকরণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব পালন করবে ইপসা ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এন্টারপ্রাইজ। এ কার্যক্রমে জেলা প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে কোনো অর্থ লেনদেন হবে না। প্রাথমিকভাবে চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে এক বছর।

জেলা প্রশাসনের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এবং চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি পাঠান মো. সাইদুজ্জামান। ইপসার পক্ষে সই করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (অর্থ) পলাশ কুমার চৌধুরী।

জেলা প্রশাসক বলেন, চিড়িয়াখানার এ উদ্যোগ দেখে বিভিন্ন এলাকার মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্লাস্টিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে দেশে সংগৃহীত প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত ও পুনর্ব্যবহারের উপযোগী প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত না থাকাকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সবাই যদি ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহে এগিয়ে আসে, তাহলে ভবিষ্যতে এটি বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে। তবে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহারে গুরুত্ব

প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, প্লাস্টিকের সঠিক ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি পাটসহ প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ইপসার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি চিড়িয়াখানার বাইরেও এ ধরনের কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও প্লাস্টিক সংগ্রহে মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে। এতে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

চিড়িয়াখানাকে আরও সবুজ করার পরিকল্পনা

পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের পাশাপাশি চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাকে আরও সবুজ ও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, চিড়িয়াখানায় প্রায় ১৫০টি ডাবগাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। সাদা বাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী এবং প্রাণী বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন প্রজাতি যুক্ত হওয়ায় চিড়িয়াখানার আকর্ষণ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চিড়িয়াখানা পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, শিশুরা পশুপাখি দেখার পাশাপাশি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। মুঠোফোনের পর্দার বাইরে এসে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরিতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকতসহ জেলা প্রশাসন ও ইপসার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরিবেশগত গুরুত্ব: শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্লাস্টিক সংগ্রহের এ উদ্যোগ সফল করতে নিয়মিত সংগ্রহ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনর্ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এক বছরের সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন এ ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে সংগৃহীত প্লাস্টিকের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতার ওপর।

সর্বশেষ