মজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলায় বড় প্রবৃদ্ধি

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

আসন্ন পবিত্র মাহে রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব পণ্যের আমদানি ও ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ বেড়েছে। এতে রমজানে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

- Advertisement -

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। সভায় রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের মজুত, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি রমজানে নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজারদর স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি ও শুল্কসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। এ সময়ে ভোজ্যতেলের এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার টনের, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি। পাশাপাশি সয়াবিন বীজ আমদানিও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ১৩ হাজার টন বেশি।

চিনির ক্ষেত্রেও আমদানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন চিনি আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৩৪ হাজার টন। ফলে আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন। এ সময়ে চিনির এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার টনে।

রমজানে ইফতারের অন্যতম উপকরণ ছোলার আমদানিতে আরও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৮২ হাজার টন ছোলা আমদানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল মাত্র ১২ হাজার টন। অর্থাৎ ছোলার আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার টন। এ সময়ে ছোলার এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের।

এ ছাড়া মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। মসুর ডালের এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনে। অন্যদিকে, খেজুর আমদানি বেড়ে ১১ হাজার টনে পৌঁছেছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার টন।

ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এসব পণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার পরিমাণ বাড়ায় রমজানে বাড়তি চাহিদা মেটানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এদিকে স্থানীয় বাজারে ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও মসুর ডালের দাম কিছুটা কমেছে। ভোজ্যতেল ও চিনির দামও স্থিতিশীল রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।

খেজুরের শুল্ক কাঠামো সহজ করার তাগিদ

সভায় খেজুরের আমদানি ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা খেজুরের জাত, মান ও দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক কাঠামো আরও সহজ, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

তিনি জানান, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি করা হয়। এ কারণে সব ধরনের খেজুরের ক্ষেত্রে একই মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। আমদানিকারকদের সুবিধার্থে সহজবোধ্য শুল্কব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

শুল্ক নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হলেও এ বিষয়ে কার্যকর সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

সভায় খেজুরের প্রচলিত শুল্কসুবিধা দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি খেজুরের নির্ধারিত মূল্য ধরে শুল্কায়নের পরিবর্তে পণ্যের প্রকৃত মান ও আমদানি মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের প্রস্তাব আলোচনায় আসে।

আমদানিকারকদের মতে, সাধারণ মানের খেজুরের প্রকৃত আমদানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুল্কায়ন না হলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এর সঙ্গে বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহার, অতিরিক্ত পরিবহন খরচ এবং এলসি খোলার জটিলতা যুক্ত হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

ফল আমদানিকারকেরাও উচ্চ করহারের বিষয়টি তুলে ধরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ফল আমদানির কর কাঠামো সহনীয় করার দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের দিকেও নজর

ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে মসুর ডালের দাম কমেছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যপ্রবণতা, আমদানি ব্যয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সভায় জানানো হয়, ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে বর্তমানে শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক সমন্বয় করা গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়তা মিলতে পারে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় বাজারে তাজা ফলের দামও কিছুটা কমেছে।

সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি বৃদ্ধি রমজানে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ভোক্তারা কতটা সুফল পাবেন, তা নির্ভর করবে আমদানি ব্যয়, শুল্কনীতি, বাজারে পণ্যের প্রকৃত সরবরাহ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।

সর্বশেষ