ব্যাটারিচালিত রিকশায় নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, ফি ৮–১০ হাজার টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

নিজস্ব প্রতিবেদক: সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন, গতিসীমা, রুট নির্ধারণ ও পার্কিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। নতুন নিয়মে দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা এবং চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার জন্য ১০ হাজার টাকা। নিবন্ধনের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও প্রতি বছর তা নবায়ন করতে হবে।

- Advertisement -

বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করে। এতে ই-রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ, চলাচলের এলাকা, চালকের আচরণ, চার্জিং স্টেশন এবং পুরোনো ব্যাটারির ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ায় ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জারি করা আগের বিধিমালাটি রহিত করা হয়েছে।

নিবন্ধনে লাগবে ফিটনেস সনদ

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ই-রিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধন পেতে আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, দুই কপি ছবি, ফি জমার রসিদ ও নির্ধারিত ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে।

আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আবেদন বাতিল হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ লিখিতভাবে জানাতে হবে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করা যাবে।

প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে নম্বর প্রদর্শন করতে হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসারে ফিটনেস সনদ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর ছাড়া নিবন্ধন ও নবায়ন করা যাবে না।

বিধিমালায় ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। এই মেয়াদ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট গাড়ির নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব যানবাহনকে বিমার আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।

সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার

ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চালানো যাবে না।

ই-রিকশায় চালক ছাড়া নির্ধারিত আসনসংখ্যা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য ব্যক্তিগত মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হর্নের শব্দের তীব্রতা ৪০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না।

চালকদের সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম এবং অনিয়মিতভাবে লেন পরিবর্তন করা যাবে না। বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা এবং দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়াকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচল নিষিদ্ধ

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডর এবং প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সড়কে চলতে পারবে না। ফুটপাতেও এসব যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ।

সিটি করপোরেশনগুলো সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজ নিজ এলাকায় ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করবে। প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক বা জোনভিত্তিকভাবে সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে।

চলাচল নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট নির্ধারণ করবে। প্রতিটি জোনের জন্য ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের পথ ও নির্দিষ্ট রং ঠিক করা হবে। এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলতে পারবে না। একইভাবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না।

নির্ধারিত স্থানে পার্কিং ও চার্জিং

ই-রিকশার অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও চার্জিং ঠেকাতে প্রতিটি ওয়ার্ডে বা উপযুক্ত স্থানে পার্কিং এলাকা নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করবে।

ব্যাটারি চার্জ দিতে হবে অনুমোদিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্ধারিত গ্যারেজে। এসব স্থানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ ও ব্যাটারি বিনিময় কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগও রাখা হয়েছে। এসব স্থাপনার জন্য সরকারি অনুমোদন নিতে হবে।

অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

পুরোনো ব্যাটারি ফেলা যাবে না যত্রতত্র

ব্যাটারি থেকে পরিবেশদূষণ ঠেকাতে বিধিমালায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি কিংবা এর অংশবিশেষ খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যে ফেলা যাবে না। ব্যাটারি পোড়ানোও নিষিদ্ধ।

নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে ক্রেতার কাছ থেকে একটি পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানো যাবে না। পুরোনো ব্যাটারি অনুমোদিত এজেন্ট, ডিলার বা সংগ্রহকারীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

উৎপাদনেও আসছে অনুমোদনব্যবস্থা

ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, বুয়েট বা অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের যান্ত্রিক ও বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধি এবং জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা থাকবেন। কমিটির সুপারিশ ও সরকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উৎপাদন লাইসেন্স দেবে।

নিবন্ধন ও নবায়ন ছাড়া ই-রিকশা চালানো, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, মোটর বা গাড়ির কাঠামো পরিবর্তন এবং নিষিদ্ধ এলাকায় চলাচলসহ বিভিন্ন অনিয়মকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

নতুন বিধিমালার মাধ্যমে ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচল ও কারিগরি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নিয়মগুলো বাস্তবে কার্যকর করতে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া, অনুমোদিত রুট, চার্জিং অবকাঠামো এবং তদারকির ব্যবস্থা কতটা দ্রুত গড়ে তোলা যায়, তার ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে।

সর্বশেষ