নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ২০০ কোটি ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানি ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের অস্ত্র, বিস্ফোরক ও ভারী ট্রাক আমদানি করেছে ইরান। এ কার্যক্রম পরিচালনায় পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থার সমন্বয়ে একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

- Advertisement -

রয়টার্সের অনুসন্ধানে ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া জাহাজ চলাচলের তথ্য, পণ্য পরিবহনের নথি (বিল অব লেডিং) এবং বিভিন্ন সংস্থার আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নেটওয়ার্কটির কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং দেশটির প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বুনিয়াদ’ নামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের পরও ইরানের সামরিক বাহিনী কীভাবে অস্ত্রের মজুত পুনরায় গড়ে তুলছে, তা বুঝতে এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নেটওয়ার্কটির ‘এমওডি ৩৪৩৬৪২’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিস্ফোরক এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ আমদানি করেছে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কাজে ব্যবহার করা যায়, এমন ভারী ট্রাকও আনা হয়েছে। এসব সরঞ্জাম স্থল, নৌ ও আকাশপথে ইরানে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পণ্যগুলোর উৎস হিসেবে চীন, রাশিয়া ও জার্মানির নাম উঠে এসেছে।

রয়টার্স ইসরায়েলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘২৪০ অ্যানালিটিক্স’-এর সঙ্গে যৌথভাবে এই নেটওয়ার্কের সংস্থাগুলো শনাক্ত করেছে। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নেটওয়ার্কের ৯১টি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ফোন নম্বরের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক সিপাহে আইআরজিসি সদস্যদের অ্যাকাউন্টের নথিতে থাকা নম্বরের মিল পাওয়া গেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও রয়টার্সের পর্যালোচনা করা নথিতে চিহ্নিত এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটির ওপর পশ্চিমা সরকারগুলোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রায় ১৯ হাজার আমদানি রেকর্ডের একটি অংশ বিশ্লেষণ করে তা জাহাজ চলাচলের নথি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। এসব তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা পণ্যের প্রায় সব চালানই শুল্কমুক্ত ছিল এবং সেগুলোকে সামরিক সরঞ্জাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিস্ফোরক ও অন্যান্য উপাদানের কিছু সামগ্রী সামরিক এবং বেসামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা সম্ভব।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আমদানি চালানের প্রায় ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রেই প্রচলিত মুদ্রা স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিদেশে থাকা ইরানের বিশ্বস্ত সহযোগীরা বিদেশি ব্যাংকে সংরক্ষিত নগদ অর্থ ব্যবহার করে পণ্য কিনতেন এবং পরে সেগুলো ইরানে পাঠাতেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, জটিল ব্যবসায়িক কাঠামো, একাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার এবং বিকল্প অর্থ পরিশোধব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। এই নেটওয়ার্ক দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে রয়টার্সের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

সর্বশেষ