পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে পুঁজি করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনের আড়ালে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করা হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের পর শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও প্রতিনিধি দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বোর্ড গঠন করেছে। শিগগিরই বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্তমান মজুরি কাঠামোর তিন বছর পূর্ণ হওয়ার সময় রয়েছে। এর মধ্যেই শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নিয়ে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রত্যাশা করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক শ্রমিক বিক্ষোভ ও সহিংসতার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কয়েক দিন ধরে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। এসব ঘটনার পেছনে কারা ইন্ধন দিচ্ছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি কিছু শিল্পমালিকের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও সরকারের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে যারা কর্মপরিবেশ নষ্ট করছেন, শিল্পকারখানা বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি করছেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও, অডিও এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করা হয়েছে।
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শিল্প, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব। দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকেরা কর্মহীন হয়ে পড়ুক, সরকার তা চায় না।
সোমবার বিকেল ৩টায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সকালে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে—এমন কারখানার তালিকা এবং অস্থিরতা তৈরিতে জড়িত সংগঠন ও নেতাদের পরিচয় জানতে মালিকপক্ষের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক অস্থিরতার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দাবি, শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষায় যারা কাজ করেন, তারা কখনোই নিজেদের কর্মসংস্থান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করতে চাইবেন না। বরং পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থক কিছু ব্যক্তি শ্রমিকদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে কোনো রাজনৈতিক ইঙ্গিত বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করা হবে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রস্তুতির বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমঝোতার মাধ্যমে সংকট নিরসনের চেষ্টা করেছে। তবে এখন থেকে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে।
পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মালিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও যোগাযোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ঠিক করা হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে ‘সুরক্ষা অ্যাপস’ ব্যবহার এবং পুলিশ সদর দপ্তরে কন্ট্রোল রুম স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
কিছু শিল্পমালিকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কয়েকজন শিল্পমালিকের ভূমিকার তথ্য সরকারের হাতে রয়েছে। তাদের কেউ কেউ অতীতে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশে নতুন করে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের মাস। এ মাসে সরকারের নিজস্ব কর্মসূচি থাকবে। পলাতক আসামি বা পতিত শক্তির কেউ কোনো পরিকল্পনা করলে তাদের সে বিষয়ে প্রশ্ন করা উচিত।
শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন জানানো হয়েছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে আদালতের রায় ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা চায় না। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখাই সরকারের লক্ষ্য। এ জন্য মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

