ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। দেশটির এমন ঘোষণায় ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পথ উন্মুক্ত করতে পারে তেহরান। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেই এ সিদ্ধান্তের কথা জানাল ইরান।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার (৭ নভেম্বর) তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সংক্রান্ত নীতির পরিবর্তনের কথা জানান।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটারে সীমিত রাখার স্বঘোষিত নীতি আর বহাল নেই। তবে ইরান শুধু কথার মাধ্যমে নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রমাণ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যদিও দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ঠিক কত দূর পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি এই সামরিক কর্মকর্তা।
এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত এক বিবৃতিতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের হুমকির জবাব ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই দেওয়ার কথা বলা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছাড়াও গ্রিস ও বলকান অঞ্চলের কিছু অংশে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। ফলে এর চেয়ে বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
ইরান নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটারে সীমিত রাখার কথা বলে আসলেও গত মার্চে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলার চেষ্টা চালানোর খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ইরান থেকে ঘাঁটিটির দূরত্ব প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। তবে ওই হামলার চেষ্টা সফল হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের মহাকাশ কর্মসূচিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব।
অন্যদিকে ইরানের সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের স্থলসীমান্ত ও কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে অস্ত্র এবং নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত পণ্য পরিবহন ঠেকাতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে।
‘টাস্কফোর্স আয়রন গেট’ নামের এ উদ্যোগের সদর দপ্তর হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পায়। মার্কিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এই বিশেষ বাহিনী। অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ইরানে প্রবেশ ঠেকানো এবং দেশটির অর্থনৈতিক আয়ের উৎস সীমিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অর্থ, পররাষ্ট্র ও বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে টাস্কফোর্সটি।
সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, বিভিন্ন মার্কিন সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ইরানের অস্ত্র উৎপাদন, সামরিক সরঞ্জাম মজুত এবং সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের সুযোগ সীমিত করা হবে।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধ এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক এবং ভারী যানবাহন আমদানির জন্য গোপন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়।
এসব সরঞ্জাম রাশিয়া থেকে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে জাহাজে, মধ্য এশিয়া থেকে ট্রাকে এবং চীন থেকে কার্গো উড়োজাহাজের মাধ্যমে ইরানে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এদিকে মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছে সেন্টকম।
সব মিলিয়ে একদিকে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে পুরোনো সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়ার ঘোষণা, অন্যদিকে ইরানের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানির পথ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ—দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলছে। সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল, রয়টার্স

