spot_imgspot_img
spot_imgspot_img

যুদ্ধের ধাক্কা সামলে ইরানের পাল্টা আঘাতের শক্তি কোথায়?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। দীর্ঘ এই সংঘাতে ইরানের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অর্থনীতি পড়েছে তীব্র চাপে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বেও এসেছে বড় পরিবর্তন।

- Advertisement -

তারপরও তেহরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ভেঙে পড়েনি। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য হুমকি হয়ে আছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। শুরুতে ওয়াশিংটন দ্রুত ফল পাওয়ার আশা করলেও ছয় মাস পরও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সামরিক অভিযানের পাশাপাশি এখন ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করতে নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
শুরুতেই বড় ধাক্কা ইরানের নেতৃত্বে
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিঘাত পড়ে ইরানের নেতৃত্বে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পরে তার ছেলে মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। যুদ্ধের শুরুতেই গুরুতর আহত হওয়ায় তার প্রকাশ্য উপস্থিতি সীমিত রয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তিনি আড়াল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাব আরও বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধজুড়ে তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি করেছেন এবং তেহরান পাল্টা হামলা চালালে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

কী চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস এবং সামরিক অবকাঠামো দুর্বল করা।

ছয় মাসের অভিযানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, অস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো ও নৌ সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যাপক হামলার দাবি করলেও এসব পরিসংখ্যানের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তবে সামরিক হামলা ইরানকে দুর্বল করলেও দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোর কিছু অংশ টিকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুরো ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস হয়নি
যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। এর মধ্যে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল।

হামলায় এসব অস্ত্রের বড় অংশ ধ্বংস হলেও ইরানের হাতে ঠিক কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। দেশটির দীর্ঘদিনের কৌশল ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের একটি অংশ ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় রাখা। ফলে ওপরের অবকাঠামো ধ্বংস হলেও গভীরে থাকা অস্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন।

এ ছাড়া মোবাইল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা থাকায় প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণযন্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করাও কঠিন।

কম খরচের ড্রোনে বড় চাপ
ইরানের পাল্টা হামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ড্রোন। শাহেদ সিরিজের ড্রোন তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায়। বিপুলসংখ্যক ড্রোন একসঙ্গে ছোড়া হলে প্রতিপক্ষকে সেগুলো শনাক্ত ও প্রতিহত করতে ব্যাপক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়।

এতে তুলনামূলক কম খরচে প্রতিপক্ষের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা সম্ভব। তবে ড্রোন উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ও শিল্প সরঞ্জামের একটি অংশের জন্য ইরান এখনো বিদেশের ওপর নির্ভরশীল।

পাল্টা হামলা মানেই শক্তির সমতা নয়
ইরানের সাম্প্রতিক হামলা দেখিয়েছে, দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তবে একই সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে।

সাম্প্রতিক এক হামলায় জর্ডান জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১০টি প্রতিহত করা হয়েছে। বাহরাইনও ইরানের ড্রোন ধ্বংসের কথা জানিয়েছে।

অর্থাৎ ইরান পাল্টা হামলা চালাতে পারছে মানেই যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক শক্তির সঙ্গে সমানে সমান লড়াই করতে পারছে-এমন নয়। তেহরানের কৌশল এখন অনেকটাই টিকে থাকা, প্রতিপক্ষের ওপর ব্যয় চাপানো এবং ইরানের ওপর হামলার পরিণতি নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

হরমুজ প্রণালীও বড় হাতিয়ার
ছয় মাসের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

সংঘাতের পর সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমেছে। ২ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। আগের ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১৩টি।

ফলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়েছে।

অর্থনীতিতে বড় আঘাত ইরানের
সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতিও বড় চাপের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, নৌ-অবরোধ ও তেল রপ্তানিতে বাধার কারণে দেশটির প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসে বড় ধাক্কা লেগেছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ইরানের অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল থাকলেও আগস্টে তা কমে আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে।

২৪ আগস্ট মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা ও আর্থিক লেনদেনে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেয়।

ছয় মাস পর হিসাবটা কী
ছয় মাসের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো-কেউই এখন পর্যন্ত স্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করেছে। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা দুর্বল, নৌ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত এবং অর্থনীতি গভীর সংকটে। কিন্তু ইরানের সরকার টিকে আছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার একটি অংশ অক্ষত রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত জায়গায় চাপ তৈরির ক্ষমতাও ধরে রেখেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এখন সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে সংঘাতটি দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে।

ছয় মাসের যুদ্ধে ইরান আগের অবস্থানে নেই। দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতবিক্ষত। কিন্তু একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করা আর তার প্রতিরোধক্ষমতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া এক বিষয় নয়।

ইরানের হাতে এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র, মোবাইল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালীতে চাপ তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। আর সেই সীমিত সক্ষমতাই যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য ইরানকে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক হুমকি হিসেবে ধরে রেখেছে।

spot_imgspot_img
spot_imgspot_img

সর্বশেষ