মো.মোক্তার হোসেন বাবু :চট্টগ্রাম বিভাগের কারাগারগুলোতে মাদক মামলার আসামি ও মাদকাসক্ত বন্দিদের সঙ্গে একই স্থানে রাখা হচ্ছে অন্যান্য মামলার বন্দিদের। কারা কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এতে কারাগারের ভেতর থেকেই মাদকের সংস্পর্শে আসছেন নতুন বন্দিরা। ফলে সাজা বা বিচারাধীন অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের একটি অংশ কারাগার থেকে বের হওয়ার পরও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকছেন।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদকাসক্ত বন্দিদের জন্য পৃথক স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি কারা অধিদপ্তরে পাঠানো ওই প্রস্তাবে মাদকাসক্ত বন্দিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং অন্যান্য বন্দিদের থেকে পৃথক রাখার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে থাকা বন্দিদের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মাদক মামলার আসামি। চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে মাদকাসক্ত বন্দির হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। বিপুলসংখ্যক মাদকাসক্ত ও মাদক মামলার বন্দিকে অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত বন্দিদের সঙ্গে একই কারাগারে রাখায় অপরাধের নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি-প্রিজন্স) ছগির মিয়া বলেন, দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে সব ধরনের বন্দিকে একই ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাখা হয়। এতে মাদকাসক্ত বন্দিদের সংস্পর্শে এসে অন্য বন্দিদেরও মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি বলেন, মাদক আইনে গ্রেপ্তার হওয়া মাদকাসক্ত বন্দিদের অন্য মামলার বন্দিদের কাছ থেকে আলাদা রাখা গেলে তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হবে। একই সঙ্গে কারাগার থেকে মুক্তির পর তাদের পুনরায় মাদক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও কমানো সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যেই মাদকাসক্ত বন্দিদের জন্য পৃথক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারে আরেক সংকট
শুধু মাদকাসক্ত বন্দিদের আলাদা রাখাই নয়, বাংলাদেশি বন্দিদের কাছ থেকে রোহিঙ্গা বন্দিদের পৃথক রাখারও প্রস্তাব করেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা কর্তৃপক্ষ।
প্রস্তাবে কক্সবাজার জেলা কারাগারের বন্দি পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারটির ধারণক্ষমতা ৪০০ জন হলেও সেখানে গড়ে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার বন্দি অবস্থান করেন। এর মধ্যে অন্তত ১ হাজার ২০০ জন রোহিঙ্গা।
অতিরিক্ত বন্দির চাপের পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন অপরাধে জড়িত বন্দিদের একই ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাখায় কারাগারের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
ডিআইজি-প্রিজন্স ছগির মিয়ার ভাষ্য, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বন্দিদের অপরাধের ধরন ও মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে। রোহিঙ্গা বন্দিদের একটি অংশ মাদক, চোরাচালান ও বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে কারাগারে আসছেন। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশি বন্দিদের একই কারাগারে রাখলে অপরাধের ধরন ও কৌশল এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১২ কারাগারে চাপ
চট্টগ্রাম বিভাগে বর্তমানে মোট ১২টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় রয়েছে দুটি কেন্দ্রীয় কারাগার। এসব কারাগারের বন্দি ধারণক্ষমতা একদিকে সীমিত, অন্যদিকে মাদক ও অন্যান্য মামলার বিপুলসংখ্যক বন্দির কারণে ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৪৯ জন। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৭৪২ জন। এছাড়া রাঙামাটি জেলা কারাগারে ১৪৫, বান্দরবান জেলা কারাগারে ১১৪, খাগড়াছড়িতে ৮১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৭৮০, কক্সবাজারে ৮৩০, চাঁদপুরে ৪৭৫, নোয়াখালীতে ৫০০ এবং লক্ষ্মীপুরে ২৯৫ জন বন্দি ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে।
ফেনী জেলা কারাগার-১-এর ধারণক্ষমতা ৩৯২ জন এবং কারাগার-২-এর ধারণক্ষমতা ১৭২ জন।
কারা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বন্দিদের আটকে রাখাই কারাগারের উদ্দেশ্য নয়; সংশোধন, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে অপরাধে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা কমানোও কারা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু একই স্থানে মাদকাসক্ত, মাদক মামলার আসামি এবং অন্যান্য অপরাধের বন্দিদের রাখার কারণে সেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের মতে, মাদকাসক্ত বন্দিদের জন্য আলাদা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা চালু করা গেলে কারাগারকে অপরাধ ছড়ানোর জায়গা হিসেবে নয়, বরং সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা বন্দিদের পৃথক ব্যবস্থাপনায় রাখলে কারাগারের নিরাপত্তা ও বন্দিদের পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।




