মো.মোক্তার হোসেন বাবু: আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বারবার সমন জারি হয়েছে। এরপর জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এমনকি জামিন অযোগ্য পরোয়ানাও। কিন্তু তাতেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে হাজির হচ্ছেন না পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য। বর্তমানে ও অতীতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) কর্মরত থাকা প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এমন পরিস্থিতিতে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে বিভিন্ন মামলার বিচার কার্যক্রম। আদালতের একাধিক নির্দেশ ও সমন উপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই কঠোর অবস্থানে যেতে হয়েছে বিচারিক আদালতগুলোকে।
আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব পুলিশ সদস্য বর্তমানে সিএমপিতে কর্মরত কিংবা দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে বদলি হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন। অনেকে চট্টগ্রামের বাইরে বিভিন্ন জেলা ও ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের আদালতে হাজিরা নিশ্চিত করতে সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ১৮টি পৃথক স্মারকে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটপ্রধানদের তাঁদের অধীন পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত দিনে সকাল ৯টায় আদালতে হাজির করার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে কোনো সদস্য আবার অনুপস্থিত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫(ক) ধারা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
বদলি হলেই থেমে যাচ্ছে সাক্ষ্য
আদালতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো মামলার তদন্ত কিংবা ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনের সময় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁদের বদলি হয়ে অন্য জেলা বা ইউনিটে চলে যাওয়ার পর আদালতের সমন যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে পৌঁছানো, ছুটি বা ছাড়পত্র পাওয়া এবং আদালতে হাজিরা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে একই মামলায় বারবার তারিখ পড়লেও সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। একপর্যায়ে আদালত থেকে সমন, পরোয়ানা এবং জামিন অযোগ্য পরোয়ানা পর্যন্ত জারি করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যেসব পুলিশ সদস্যকে সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অনেকেই বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত। এ তালিকায় সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও বিশেষায়িত গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যও রয়েছেন।
তাঁদের বড় একটি অংশ একসময় সিএমপির পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও ইপিজেড থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
একাধিক আদালতে ঝুলছে মামলা
পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত এবং শিশু আদালতে থাকা একাধিক মামলার বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গুরুতর অপরাধের মামলাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরের একটি হত্যা মামলায় সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তৃতীয় আদালত।
অভিযোগ গঠনের পর মামলাটির বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রপক্ষ একাধিকবার সাক্ষীদের হাজির করার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।
আদালতের আদেশে নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীকে হাজির করতে ব্যর্থ হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১(২) ধারায় উদ্ভূত আইনি জটিলতার দায় পুলিশ কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বাইরে নোয়াখালীতেও কড়াকড়ি
শুধু চট্টগ্রামেই নয়, দেশের অন্যান্য জেলাতেও পুলিশ সদস্যদের আদালতে সাক্ষ্য দিতে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। নোয়াখালীতে আদালতে পুলিশ সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নোয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে ১২১ জন পুলিশ সদস্যকে আদালতে নির্ধারিত তারিখে উপস্থিত থাকার জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো সদস্য যৌক্তিক কারণ ছাড়া আদালতে অনুপস্থিত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রস্তুত করা প্রতিবেদন রেঞ্জ ডিআইজি এবং পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের দায়িত্বে থাকা সদস্যরাও তালিকায়
সিএমপির পক্ষ থেকে এর আগেও শত শত পুলিশ সদস্যকে আদালতে হাজির করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত পুলিশ সদস্যদের একটি অংশ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সেই সময়কার দায়িত্ব, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং পরবর্তী বদলির কারণে অনেক পুলিশ সদস্য আদালতে হাজির হতে অনীহা দেখাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করার বিষয়টি বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে।
বিচার বিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত বিচারপ্রার্থী
আইনজীবীরা বলছেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী যদি আদালতে উপস্থিত না হন, তাহলে শুধু একটি শুনানির তারিখই নষ্ট হয় না; পুরো বিচারপ্রক্রিয়াই দীর্ঘায়িত হয়। বিশেষ করে পুলিশ সদস্যরা অনেক মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হওয়ায় তাঁদের অনুপস্থিতির প্রভাব আরও বেশি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বদলি বা কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে কোনো পুলিশ সদস্যের আদালতে হাজিরা নিশ্চিত করা কঠিন হলে পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের মাধ্যমে তা সমাধান করা প্রয়োজন। আদালতের সমন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সদস্যকে যথাসময়ে হাজির করানোর দায়িত্বও পুলিশ প্রশাসনের।
একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ বারবার অমান্য করা হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। প্রয়োজনে সাক্ষীদের নিরাপত্তা, যাতায়াত ও প্রশাসনিক ছাড়পত্র নিশ্চিত করে আদালতে উপস্থিতির ব্যবস্থা করতে হবে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির ঘটনা তাই শুধু সাক্ষীর অনুপস্থিতির বিষয় নয়; এটি মামলার বিচার নিষ্পত্তিতে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার একটি বড় চিত্রও সামনে এনেছে।

