নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাগেরহাটের রামপালে ৮ ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধাসহ ৪৪২ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করা হবে। মূল প্রস্তাবে ব্যাটারি স্টোরেজের ব্যবস্থা রাখা হয়নি; উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।
একনেক সভা শেষে বুধবার আয়োজিত ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মূল প্রকল্পে সম্পূরক ব্যবস্থার আওতায় চার ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজের পরিকল্পনা ছিল। তবে একনেকের নির্দেশনা অনুযায়ী আলাদা কোনো সম্পূরক প্রকল্প না নিয়ে মূল ডিপিপির মধ্যেই আট ঘণ্টার স্টোরেজ সুবিধা যুক্ত করা হবে।
বাড়বে প্রকল্প ব্যয়
প্রতিমন্ত্রী জানান, ব্যাটারি স্টোরেজের সক্ষমতা বাড়ানোর কারণে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়বে। তবে সংশোধিত ব্যয়ের হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নতুন করে হিসাব করার পরই প্রকল্পের ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত ব্যয় হলেও বড় পরিসরের স্টোরেজ সুবিধা প্রকল্পটিকে আরও কার্যকর করবে। এর মাধ্যমে দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে, এমনকি রাতেও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প
রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের জন্য প্রস্তুত করা জমিতেই নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ এগিয়ে না যাওয়ায় প্রকল্পের জন্য প্রস্তুত করা বিপুল পরিমাণ জমি অব্যবহৃত রয়েছে।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ওই এলাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) প্রায় ৬৮৫ একর জমি ভরাট করেছে। নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে এই প্রস্তুত জমিই কাজে লাগানো হবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা অন্য স্থান খোঁজার প্রয়োজন হবে না।
তবে রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত মূল্যায়ন ও ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
পরিবেশবান্ধব প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটিকে পরিবেশগত শ্রেণিবিন্যাসের আওতায় ‘সবুজ’ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পকে লাল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সবুজ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে প্রকল্প প্রণয়নের সময় পরিবেশসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে নতুন একটি নীতিকাঠামো তৈরির কাজ চলছে। নতুন কাঠামোর আওতায় প্রকল্পের ডিপিপিতে ১০ থেকে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পৃথক প্রতিবেদন যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অবকাঠামো নির্মাণে মান নিশ্চিতের নির্দেশনা
একনেক সভায় অনুমোদিত অন্যান্য প্রকল্পের বিষয়েও বিভিন্ন নির্দেশনার কথা তুলে ধরেন সাকি। তিনি বলেন, কয়েকটি প্রকল্প নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ বাস্তবায়নের শর্তে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে প্রকল্পগুলো আবার একনেকে উপস্থাপন করতে হবে।
নির্মাণকাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সভায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কোনো সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণের তিন বছরের মধ্যে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকেই তা মেরামত করতে হবে। এ জন্য চুক্তিতে প্রয়োজনীয় গ্যারান্টি ও ওয়ারেন্টির শর্ত যুক্ত করা হবে।
এ ছাড়া জনবসতিপূর্ণ এলাকার সড়ক প্রকল্পে বাধ্যতামূলকভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতার কারণে বৃষ্টির পানি জমে গ্রামীণ সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ছাড়া ভবিষ্যতে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সড়ক প্রকল্প নেওয়া হবে না।
সিটি করপোরেশন প্রকল্পেও পরিবেশ ও মাস্টারপ্ল্যান গুরুত্ব পাচ্ছে
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি এলাকার ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক ও ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পে দুই বছরের মধ্যে একটি পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি) যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে একনেক। প্রকল্পের সঙ্গে এসটিপি ও পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে, যাতে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি নদীতে গিয়ে না পড়ে।
ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও রংপুর সিটি করপোরেশনের কয়েকটি প্রকল্পও একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। এসব প্রকল্পের সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, প্রকল্পগুলোর প্রস্তুতি ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছিল এবং গত ১৮ মে প্রস্তাবগুলো সরকারের ‘গ্রিন পেজে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকার সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যমান সড়ক পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একনেক রংপুর জেলার মাস্টারপ্ল্যান ও সিটি করপোরেশনের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে প্রকল্পগুলো সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছে।
এ ছাড়া বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব পর্যাপ্ত জনবল থাকলে পরামর্শক খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে যানবাহন কেনার একটি প্রস্তাবও সরকারি বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় বাতিল করা হয়েছে।
পঞ্চগড় শহরের চারপাশে বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে সংশোধিত অর্থবছরভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন সময়সূচি নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্মাণের গুণগত মান, পরিবেশগত বিধিবিধান, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং সংশ্লিষ্ট মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

