যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কিছুটা কমে যাওয়ায় দেশটির পোশাক সরবরাহকারীদের তালিকায় অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান হারিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে চীন।
তবে মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে দেশটি তার অবস্থান ধরে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
আট মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে
অটেক্সার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩৯ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৫৬৩ কোটি ৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ফলে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে প্রায় ২৪ কোটি ডলারের ব্যবধানে দ্বিতীয় অবস্থান দখল করেছে চীন।
তবে চীনের রপ্তানির চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বছরের প্রথম আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং শুল্কসংক্রান্ত নানা পরিবর্তন ও জটিলতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাই পর্যন্ত এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মার্কিন বাজারে চীনের চেয়ে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল।
তবে আগস্টের রপ্তানি হিসাব যুক্ত হওয়ার পর চিত্র পাল্টে যায়। ওই মাসের হিসাব শেষে চীনের মোট রপ্তানি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হওয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানটি হাতছাড়া হয় বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্যও যুক্তরাষ্ট্র। দেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ আসে এই বাজার থেকে।
গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলেও বাজারটির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এক বছরে ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল।
এর পরের বছর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাবে রপ্তানি কমে যায়। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২৫ শতাংশ কমে ৭২৯ কোটি ডলারে নেমে আসে।
২০২৪ সালে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়। ওই বছর রপ্তানি বেড়ে ৭৩৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৮২০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিতেও ধাক্কা
বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পাশাপাশি চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানিতেও পতন দেখা গেছে।
অটেক্সার হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা ৪ হাজার ৯০৭ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের পোশাক আমদানি করেছেন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে শুধু দেশের নিজস্ব প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিই নয়, মার্কিন বাজারের সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাবও রয়েছে।
শীর্ষে ভিয়েতনাম
মার্কিন পোশাক বাজারে সামগ্রিক আমদানি কমলেও শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে ভিয়েতনামের অবস্থানে পরিবর্তন আসেনি।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৯৭ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। যদিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটির রপ্তানিও শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ কমেছে।
সব মিলিয়ে, মার্কিন পোশাক বাজারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থান হারানোর পেছনে একদিকে যেমন দেশের রপ্তানি কমেছে, অন্যদিকে তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানির বাজারও সংকুচিত হয়েছে। তবে চীনের রপ্তানিতে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি পতন থাকলেও আগস্টের হিসাব শেষে দেশটি দ্বিতীয় অবস্থান দখল করেছে।

