উচ্চকক্ষ থেকে প্রধান-উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব: সালাহউদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

নিজস্ব প্রতিবেদক : সংবিধান সংশোধন কমিটিতে স্পিকারকে প্রধান করার বিকল্প ভাবনা, সংসদীয় কাঠামো ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা নিয়েও আলোচনা

- Advertisement -

নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন কিছু প্রস্তাব উঠে এসেছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আলোচনায়। এর মধ্যে রয়েছে সংসদের উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টা নিয়োগ, সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে নির্বাচিত স্পিকারকে এ সরকারের প্রধান করা এবং উচ্চকক্ষে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার ধারণা।

শনিবার জাতীয় সংসদে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের অধ্যাপক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে এসব প্রস্তাবের কথা জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পাশাপাশি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদের দুই কক্ষের মেয়াদ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা নিয়েও আলোচনা হয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উচ্চকক্ষ গঠনের পর সংসদ বিলুপ্ত হলেও যদি উচ্চকক্ষ বহাল থাকে, তাহলে সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে মতামত এসেছে। উচ্চকক্ষ থেকে সরকারপ্রধান ও উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান রাখার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি।

তিনি জানান, বিকল্প হিসেবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ধারণা দিয়েছেন কেউ কেউ। একইভাবে উচ্চকক্ষে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে। কমিটি এসব ধারণা পর্যালোচনা করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া ও কর্মপরিধি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত মতামত দিতে বলা হয়েছে।

বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে ঐকমত্যের চেষ্টা

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে বিচার বিভাগকে বাইরে রাখা এবং রাষ্ট্রপতিকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে কীভাবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা যায়, তা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, কমিটি বিভিন্ন মতামত পর্যালোচনা করে সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করবে।

বৈঠকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব, নির্বাহী বিভাগ ও আইন প্রণয়নের কার্যক্রমের ওপর বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে আদালতের এখতিয়ার নিয়েও বিশেষজ্ঞরা মতামত দেন।

সংসদের দুই কক্ষের মেয়াদ ও ক্ষমতার ভারসাম্য

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাব এসেছে। ৬৪ জেলা ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষ আদৌ প্রয়োজন কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন কয়েকজন অংশগ্রহণকারী। বিকল্প হিসেবে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের ধারণাও এসেছে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া এবং মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে দেওয়া এবং সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে তাদের গঠন ও কর্মপরিধি নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। এ প্রসঙ্গে ‘স্ট্যাটুটরি কনস্টিটিউশনাল বোর্ড’ নামে একটি নতুন ধারণাও তুলে ধরেছেন কেউ কেউ।

সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের ভূমিকা বাড়ানোর প্রস্তাব

সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানবিষয়ক কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির পাশাপাশি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।

সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়েছে।

উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হয় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠক সূত্র জানায়, এ বিষয়ে অধিকাংশের মত হলো, আদালতের রায় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে সংসদের মাধ্যমে সংশোধনী আনতে হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি

জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির দেওয়া আপত্তির বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিরোধী দলকে কমিটির বৈঠকে অংশ নিয়ে নিজেদের মতামত জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা কোনো কোনো বিষয়ে আপত্তি শিথিল করার প্রস্তাব দিলে কমিটি তা বিবেচনা করতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখনো কমিটির আলোচনায় রয়েছে।

২০১১ সালের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা নয়

২০১১ সালের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার মতো এবারও প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই সময়ের পরিস্থিতি এক নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন কমিটি তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার বিষয়ে একমত হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তা বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। তিনি ওই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের পরিস্থিতির তুলনা করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন।

শনিবারের মতবিনিময় সভায় অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সমিতির সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, রাগীব রউফ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ একরামুল হক, অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান এবং ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবিধান সংশোধন কমিটির আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত মতামত ও প্রস্তাব পর্যালোচনার পর কমিটি তার প্রতিবেদনে সুপারিশগুলো তুলে ধরবে।

সর্বশেষ