নিজস্ব প্রতিবেদক: অসুস্থ বাবার ভরণপোষণ না দেওয়া, নিয়মিত খোঁজখবর না রাখা এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েও আর্থিক সহায়তা না করার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী বক্তা হাফেজ ক্বারি জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ করেছেন তাঁর বাবা মাওলানা মো. হেদায়েতুল্লাহ। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে হেদায়েতুল্লাহ দাবি করেন, কষ্ট করে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে আলেম ও হাফেজ বানিয়েছেন তিনি। শৈশবে ছেলের গুরুতর শারীরিক সমস্যার সময় মানুষের কাছ থেকে সহায়তা চেয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেছিলেন। অথচ বর্তমানে নিজে অসুস্থ হয়ে আর্থিক সংকটে পড়লেও ছেলের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না।
ভিডিও সাক্ষাৎকারে হেদায়েতুল্লাহ বলেন, ছেলের কাছে টাকা চাইলে তিনি তা দিতে চান না এবং তাঁর খোঁজখবরও রাখেন না। ছেলের লেখাপড়া ও চিকিৎসার পেছনে নিজের দীর্ঘদিনের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
মানুষের সহায়তায় চলেছে চিকিৎসা
হেদায়েতুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, শৈশবে জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। তখন ইমামতি করে পাওয়া সামান্য আয়ে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে মানুষের কাছ থেকে অর্থসহায়তা নিয়ে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মির্জাপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা করান তিনি।
নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরে হেদায়েতুল্লাহ বলেন, তিনি এখনো অসুস্থ এবং চিকিৎসাধীন। একপর্যায়ে গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন। সেখান থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে নিজের চিকিৎসা করালেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।
ছেলের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, নিজের কষ্টের কথা জানালে ছেলে জমি কেনার কথা বলেছিলেন। দীর্ঘদিনের লালন-পালন ও শিক্ষার পেছনে বাবার অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, অসুস্থ অবস্থায় ছেলের কাছ থেকে সামান্য সহযোগিতাও কেন পাওয়া যাবে না।
মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির অভিযোগ
হেদায়েতুল্লাহর অভিযোগ, ছেলের পরামর্শ ও প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তিনি বাজারের একটি মসজিদে ইমামতির চাকরি ছেড়ে দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার কথা জানিয়ে বাবার কাছে দোয়া চান এবং তাঁকে ক্ষমা করে দিতে বলেন। পরে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন।
কিন্তু চাকরি ছাড়ার পর প্রতিশ্রুত অর্থ পাননি বলে দাবি করেন হেদায়েতুল্লাহ। তিনি বলেন, ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পান না। ছেলের ব্যক্তিগত সহকারী ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
হেদায়েতুল্লাহর দাবি, বহুবার ফোন করেও ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। একপর্যায়ে তিনি বলেন, এখন আর টাকা-পয়সা চান না; আল্লাহর ওপর ভরসা করেই চলতে চান।
কোরবানির ঈদ নিয়েও আক্ষেপ
সাক্ষাৎকারে কোরবানির ঈদের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন হেদায়েতুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, ছেলে এলাকায় কোরবানি দেওয়ার কথা বললেও পরে নিজের বন্ধুদের জন্য কোরবানির মাংস দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজে এক টুকরো মাংসও পাননি বলে দাবি করেন।
ছেলের আর্থিক সামর্থ্য ও সামাজিক যোগাযোগের পরিধির কথা উল্লেখ করে হেদায়েতুল্লাহ বলেন, একসময় ছেলের পাশে তিনি ছিলেন; এখন ছেলে প্রতিষ্ঠিত হলেও তাঁর খোঁজখবর রাখেন না। এসব বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন তিনি।
আগের বিতর্ক ঘিরেও সমালোচনা
ইসলামী বক্তা জুবায়ের আহমাদ তাশরীফ এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গীর একটি মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর ওই শিক্ষককে নিয়ে তাশরীফের বক্তব্যও আলোচনায় আসে।
ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে ওই শিক্ষককে মারধরের দৃশ্য দেখা যায় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাশরীফ নিজের ফেসবুক পেজে নাবালক শিশুকে চুমু দেওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
তবে বাবার অভিযোগ এবং আগের বিতর্ক—দুটি বিষয়ই পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। হেদায়েতুল্লাহর বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাবার এসব অভিযোগের বিষয়ে জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

