ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাতের প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। যুদ্ধ শুরুর আট মাস পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহব্যবস্থা। সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় একদিকে বাড়ছে তেলের দাম, অন্যদিকে কয়েক গুণ বেড়েছে পরিবহন ও বীমা ব্যয়। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে জাহাজভাড়া আগের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনে গড়ে তিন ডলার খরচ হলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ব্যারেলপ্রতি পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ১৭ ডলার বা প্রায় ৫৬৭ শতাংশ।
গত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে তেল পাঠাতে ব্যারেলপ্রতি ২১ থেকে ৩৭ ডলার পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়েছে। রুট ও ট্যাংকারের ধরন অনুযায়ী এই খরচের পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে পারস্য উপসাগর থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনে। এই রুটে ভাড়া ব্যারেলপ্রতি ৩৭ ডলারের বেশি। পারস্য উপসাগর থেকে সিঙ্গাপুরে তেল পাঠাতে খরচ হচ্ছে ৩৬ ডলার। আর একই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল পরিবহনে ব্যয় হচ্ছে ২৬ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধি এবং তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার আশঙ্কা জাহাজমালিকদের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধঝুঁকির কারণে জাহাজের বীমা প্রিমিয়ামও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
তেলবিষয়ক সংবাদমাধ্যম অয়েলপ্রাইসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুলগেরিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে তেল পরিবহনকারী জাহাজের বীমা খরচে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে একটি জাহাজের বীমা করতে প্রায় দুই লাখ ডলার ব্যয় হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ২৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ জাহাজপ্রতি বীমা ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ১২ গুণ।
এদিকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গত রোববার ব্রেন্ট ক্রুডের প্রতি ব্যারেলের দাম ছিল ১১৩ দশমিক ৪৩ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম দাঁড়ায় ১০৪ দশমিক ১২ ডলারে। গত এক বছরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ৭৫ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৭০ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
গত অক্টোবরে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে গোল্ডম্যান স্যাকস জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নৌপথে তেল পরিবহনের ভাড়া ব্যারেলপ্রতি ৩৫ ডলারে উঠেছিল। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের আশঙ্কায় প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত সাত ডলার ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে চার ডলার এবং ওমান উপসাগরে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরে আরও চার ডলার অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেল পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে ট্যাংকারগুলোকে সমুদ্রে বেশি সময় অবস্থান করতে হচ্ছে। এতে নতুন চালান পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জাহাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্যাংকারের সংকটের কারণে তেল পরিশোধনাগারগুলোকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে পারস্য উপসাগর থেকে এশিয়ায় অপরিশোধিত তেল পরিবহনের ভাড়া ব্যারেলপ্রতি ৩৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এই রুটে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রুটেও জাহাজভাড়া বেড়েছে। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ইউরোপে তেল পরিবহনে ব্যারেলপ্রতি ভাড়া ২২ ডলার ছাড়িয়েছে, যা সংঘাতের আগের তুলনায় চার গুণের বেশি। অন্যদিকে উত্তর সাগর অঞ্চল থেকে তেল পরিবহনের খরচ বেড়ে তিন গুণের বেশি হয়ে ব্যারেলপ্রতি ছয় ডলার ছাড়িয়েছে।
জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা অপরিশোধিত তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ডিজেল, পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির সরবরাহ এবং দামেও এর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন খরচ বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ থেকে ৭৩ ডলারের মধ্যে ছিল। কিন্তু ২ নভেম্বর ২০২৬ নাগাদ তা প্রায় ১১২ ডলারে পৌঁছায়। ফলে সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় দাম বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা এবং তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ওই দিন ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৪৮ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ছিল ৬৭ দশমিক ০২ ডলার।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। যুদ্ধের কারণে পরিবহন, বীমা ও জ্বালানি ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে এর প্রভাব শুধু তেল আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও এর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: অয়েলপ্রাইস ডটকম, রয়টার্স

