আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) শুরু হয়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। কংগ্রেসের দুই কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে নির্বাচনে লড়ছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি ও বিরোধী ডেমোক্র্যাট পার্টি। একই সঙ্গে এ নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও কর্মকাণ্ডের প্রতি ভোটারদের সমর্থন যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে। তবে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত পাওয়ায় প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার আশা করছে ডেমোক্র্যাটরা। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারও তাদের লক্ষ্য। তবে এ লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের জন্য চ্যালেঞ্জ বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত কংগ্রেসে আসন হারায়। এবারও সেই প্রবণতা কাজে লাগিয়ে অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। দেশজুড়ে কয়েক ডজন সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি তাঁর সমর্থকগোষ্ঠী ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা সমর্থকদের রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। নির্বাচনের ফলকে নিজের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন হিসেবেও তুলে ধরেন তিনি। তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে তাঁর জনপ্রিয়তা ৩৩ থেকে ৩৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার, বিদেশি পণ্যে শুল্ক আরোপ এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও নির্বাচনী আলোচনায় এসেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ জরিপে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের মধ্যে পাঁচটিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন বলে উঠে এসেছে। এর মধ্যে টেক্সাস ও কানসাসের আসনও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান দুর্বল।
তবে নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট শিবিরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ দেখা দিয়েছে। মিশিগানে দলীয় মনোনয়নে পরাজিত কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার। তিনি একে ‘নিন্দনীয় বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
আলাস্কায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার প্রচারশিবিরের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের নামের সঙ্গে মিল রয়েছে, এমন একজন প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এ ঘটনায় নিজের প্রচারশিবিরের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন পেলটোলা। এদিকে আলাস্কার নির্বাচনী ফল প্রত্যয়ন ঠেকাতে মার্কিন বিচার বিভাগের করা মামলাটি আদালত খারিজ করে দিয়েছেন।
দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। গার্ডিয়ানের জন্য পরিচালিত এক হ্যারিস জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির চেয়ে নিজেদের সম্পদ বাড়াতে বেশি আগ্রহী। সরকারি নথি অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্পের আয় বেড়েছে প্রায় ২২০ কোটি ডলার।
নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী টড ব্ল্যাঞ্চের নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগ দেশজুড়ে এক হাজার নির্বাচনী পর্যবেক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এ উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে।
এবারের নির্বাচনের ফল কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে বাধার মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে রিপাবলিকানরা প্রশাসনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সুবিধা পাবে। তাই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রতি ভোটারদের মনোভাবও এ নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হবে।

