নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক বলে জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। এ বিষয়ে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে তরুণদের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে কমিটি। তবে গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ তুলে কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভা বর্জন করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের অধিকাংশ, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও ইসলামি ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বিশেষ কমিটির এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রিত ৬২ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ৩১ জন।
সভায় অনুপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, নেতা সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এসএম ফরহাদ, ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক তাহমীদ আল মুদাসসীর চৌধুরী এবং ইসলামি ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মুনতাছির আহমাদ ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদও সভায় অংশ নেননি।
অন্যদিকে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাছির, ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক সানজিদা আহমেদ তন্বি, জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ফ্রন্ট ও ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রতিনিধিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভা বর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ফেসবুক পোস্টে জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী হওয়ায় তাঁরা এ মতবিনিময় সভা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার। কেবল কয়েকটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য এ আন্দোলন হয়নি। সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্র সংস্কার এক বিষয় নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে আসিফ মাহমুদ এক ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে গণভোটে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামি ছাত্র আন্দোলনের বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের রায় উপেক্ষা করে এ ধরনের মতবিনিময় সভা আয়োজনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ কারণে সংগঠনটি সভায় অংশ নেয়নি।
সভায় উপস্থিত ছাত্রনেতাদের আলোচনায় সংবিধানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন একজন ছাত্রনেতা। তাঁর বক্তব্য, অতীতে ফ্যাসিবাদী সরকার জরুরি অবস্থাকে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। হামলা বা মহামারির মতো পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই এ জন্য সংবিধানে বিশেষ বিধান রাখার প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
অন্য এক ছাত্রনেতা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা এবং গণহত্যার বিচারের বিধান সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন। আরেকজন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জুলাই সনদে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা উল্লেখ না থাকলে ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের মতো নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও আলোচনা হয়। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাছির। তিনি সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা উচিত। জনগণ বিএনপিকে নির্বাচিত করেছে এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য দলটিকে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখার দাবিও ওঠে সভায়। একজন ছাত্রনেতা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের মতো বিশেষ কমিটির আলোচনাও সরাসরি সম্প্রচারের প্রস্তাব দেন। এতে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে কমিটির অবস্থান ও আলোচনার বিষয়গুলো সাধারণ মানুষ জানতে পারবেন বলে মত দেন তিনি।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সভায় বলেন, গণভোটে শুধু জুলাই সনদের পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত ছিল। বিএনপির পক্ষ থেকেও এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গণভোটে একাধিক প্রশ্ন রাখায় বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় সংবিধানে শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা, গণ-অভ্যুত্থানের দাবি বাস্তবায়ন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি গণভোট ও জুলাই সনদের টেকসই বাস্তবায়নের বিষয়েও মতামত দেন অংশগ্রহণকারীরা।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, যুগে যুগে তরুণেরা জাতিকে পথ দেখিয়েছেন। তাঁদের কল্যাণে জনবান্ধব ও সময়োপযোগী সংবিধান প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’-এর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে এবং সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক। এ বিষয়ে বিরোধী পক্ষের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ কমিটির সদস্য চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও সংবিধান সংশোধনের পরিধি নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এ বৈঠকে স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে সরকার সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিকতার কথা বলছে, অন্যদিকে কয়েকটি ছাত্রসংগঠন গণভোটের রায় ও গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনগুলোর বিতর্ক অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত মিলছে।

