যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি

ইরান যুদ্ধকে দায়ী করলেন জেডি ভ্যান্স ইসরায়েলকে দেওয়া আর্থিক সাহায্য বন্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর চাপে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টি। নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ নিয়ে দলের ভেতরেই শুরু হয়েছে মতবিরোধ ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি ইরান যুদ্ধকে নির্বাচনে হারের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই ইসরায়েলকে বার্ষিক আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর এ ঘোষণাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

- Advertisement -

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ‘আমাদের হেরে যাওয়ার মূল কারণ হলো এই যুদ্ধ।’ এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আগের রাতে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ভ্যান্সের মতে, ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। এসব কারণে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে জনসমর্থন বেড়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসা ভ্যান্সের এ বক্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের ধারণা, ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ইরান যুদ্ধের দায় থেকে নিজেকে দূরে রাখার কৌশল নিতে পারেন তিনি।

ভ্যান্সের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, নির্বাচনের ফলাফল এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে ইরানের সঙ্গে সংঘাত কমানোর পথে যেতে পারে ওয়াশিংটন।

তবে ইরান নীতিতে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান ইস্যুতে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই। পরিস্থিতি আবারও একই জায়গায় ফিরে এলেও তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন। তবে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা স্বীকার করেছেন তিনি।

ইসরায়েলকে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা বন্ধের ঘোষণা

নির্বাচনের পর রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইসরায়েলকে মার্কিন আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে চলতি বছরের পর থেকে ইসরায়েলকে আর বার্ষিক আর্থিক সহায়তা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে এ সহায়তার পরিমাণ বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার।

হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দেওয়া এ ঘোষণাকে বিশ্লেষকেরা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, ইসরায়েলকে মার্কিন সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল অংশ এবং ট্রাম্পের নিজস্ব ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) শিবিরের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। এ অবস্থায় সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প উভয় পক্ষের সমালোচনা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তবে ঘোষণা দিলেই সহায়তা বন্ধ করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, বিদেশি রাষ্ট্রকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। ফলে প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে চলমান সহায়তা কর্মসূচি বন্ধ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা রয়েছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ থমাস ওয়ারিকের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তিসহ ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কর্মসূচি চালু রয়েছে। এসব কর্মসূচি বিবেচনায় নিয়ে রাতারাতি সহায়তা বন্ধ করা কঠিন। বিষয়টি বাস্তবায়নে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ ছাড়া কংগ্রেসের বিদ্যমান আইন এবং আসন্ন প্রতিরক্ষা নীতিতে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকায় জটিলতা আরও বাড়তে পারে।

ইসরায়েল প্রশ্নে মার্কিন জনমতেও পরিবর্তন

গাজা যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি দমন-পীড়নের অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমেছে। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ইসরায়েলকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সমর্থন দিচ্ছে ওয়াশিংটন।

এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সহায়তা বন্ধের ঘোষণা জনমতের চাপ কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিরোধী শিবিরে। তাঁদের মতে, কেবল ঘোষণা দিয়ে ইসরায়েল নীতিতে পরিবর্তনের দাবি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন; এর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রিপাবলিকান শিবিরে এখন পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান এবং দায় নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক চলছে। ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও ইসরায়েল নীতি-সবকিছুই উঠে এসেছে সেই আলোচনায়। তবে এ পরাজয়ের পর হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা দুর্বল হবে এবং কংগ্রেসের সঙ্গে ক্ষমতার সমীকরণ কীভাবে বদলাবে, সেটিই এখন মার্কিন রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন।

সর্বশেষ