বর্ষাকাল শেষে শরৎকালও প্রায় মাঝপথে। দেখা নেই পর্যাপ্ত বৃষ্টির। জলবায়ু পরিবর্তনের এই মারাত্মক প্রভাব পড়েছে খুলনার কৃষিখাতে। প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এই মৌসুমে খুলনায় আমন চাষ দেড় মাস পিছিয়েছে। গভীর সঙ্কটে খুলনার ৮০ হাজার আমন চাষী।
অনাবৃষ্টির কারণে আমন ও শীতকালীন শাক-সবজি উৎপাদনেও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাট পঁচানো নিয়েও হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট আম্ফান, ইয়াসসহ বিভিন্ন প্রকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি খুলনার কৃষকরা। এরমধ্যে অনাবৃষ্টি শঙ্কা বাড়িয়েছে তাদের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, বর্ষা মৌসুমে ৯৩ হাজার একশ’ ৭০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু শরৎকালের ১৫ ভাদ্র পর্যন্ত মাত্র ১৬ হাজার ৫৫৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করা সম্ভব হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৭% শতাংশ।
খুলনা জেলায় তিন হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে আউশ, এক হাজার ৩১৬ হেক্টর জমিতে পাট, ৩৫ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটো, ২৭৩ হেক্টর জমিতে তরমুজ, ২৯৫ হেক্টর জমিতে সীম, আট হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে শীতকালীন শাক-সবজির আবাদ হয়েছে। অধিকাংশ ফসলে সেচ দিতে হচ্ছে, যার ফলে বাড়ছে কৃষকদের খরচ।
সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২১ সালের জুন মাসে ৩৮৮.৮৯ মিলিমিটার, জুলাই মাসে ৫০৬ মিলিমিটার. ও আগস্ট মাসে ২১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এ বছরের জুন মাসে ৯৪.৩৬ মিলিমিটার, জুলাই মাসে ৯১ দশমিক ২৭ মিলিমিটার এবং ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ১৬১ দশমিক ১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া গ্রামের চাষি আবু হানিফ মোড়ল বলেন, “ঘেরের আইলের পাশে দশ বিঘা জমিতে শিম আবাদ করেছি। কলসে করে বয়ে এনে পানি দিয়ে আবাদ বাঁচাতে হচ্ছে। পানির অভাবে খর্ণিয়া ইউনিয়নের অর্ধেকের বেশি জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। ভদ্রা নদীর পানি দিয়ে টিপনা, বামনদিয়া, পাঁচপোতা পাথুরিয়া, গোনালী, খর্ণিয়া ও ভদ্রদিয়া গ্রামের চাষিরা আমনের আবাদ করছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে।”
ডুমুরিয়া সদরের কৃষক আবদুল মোবিন বলেন, “সেই যুবক বয়স থেকে চাষ করে আসছি। আজ কৃষক হিসেবেই অর্ধশত বছর পার করলাম। কিন্তু এবারের মতো কম বৃষ্টি আগে দেখিনি।”
পাইকগাছার চাষী আলম সরদার বলেন, “গত বর্ষায় কম বৃষ্টি হলেও শরতে বৃষ্টি ছিল প্রচুর। খুলনায় আগে বৃষ্টির কারণে বিল মাঠ তলিয়ে থাকতো। জলাবদ্ধতা দূর করতে বিভিন্ন স্থানের বাধ কাটতে হতো। এখন খাল বিলও শুকিয়ে থাকছে। নদীও ভরাট। সেচ দেওয়ার মত পানি পাওয়াও কঠিন হয়ে গেছে।”
পাইকগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় আমন রোপনের অগ্রগতি কম। রোপনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪০% আমন আবাদ হয়েছে। সাড়ে চারশ’ একর জমির উৎপাদিত পাট নদীর জোয়ারের পানিতে, আবার অন্য কোথাও গর্ত করে পলিথিন বিছিয়ে মাটি চাপা দিয়ে পঁচানো হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহায়তায় সেচ দেয়ার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দাকোপ উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, “অনাবৃষ্টির কারণে আমনের বীজতলা তৈরিতে দেরি হয়েছে। আমন আবাদ দেড়মাস পিছিয়ে গেছে। আমার কর্মস্থল পানখালী ইউনিয়নে তরমুজ ও সবজির উৎপাদন কমে গেছে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “ফুলতলা, তেরখাদা, রূপসা, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, দিঘলিয়া ও দাকোপ উপজেলায় নদী থেকে পানি উত্তোলন করে আমন আবাদ করা হচ্ছে। পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার নদীর পানি এখনও নোনা থাকায় এ দুই উপজেলায় নদীর পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে বীজতলা তৈরি শতভাগ সম্পন্ন হয়ে গেলেও এবার আমন উৎপাদন কম হবে।”