অস্টিওপোরোসিস মোকাবিলায় ৬৪ জেলায় সমন্বিত কর্মসূচির আহ্বান জুবাইদা রহমানের

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং রোগটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে দেশের ৬৪ জেলায় সমন্বিত কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, অস্টিওপোরোসিস একটি নীরব রোগ। সময়মতো শনাক্ত ও প্রতিরোধের উদ্যোগ না নিলে এ রোগের কারণে হাড় ভেঙে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।

- Advertisement -

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল ভবনের কনভেনশন হলে বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘অস্টিওপোরোসিস: প্রতিরোধযোগ্য মহামারি’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, অস্টিওপোরোসিসে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমে যায়। ফলে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ রোগ আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অস্টিওপোরোসিসের কারণে হাড় ভাঙা ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এ সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সময়। সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সর্বত্র রোগটির প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

২০২৫ সালের একটি পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্য।

উত্তর-মধ্য বাংলাদেশের ৪৫ থেকে ৮০ বছর বয়সি নারীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ওই গবেষণায় ৪০ শতাংশ নারীর অস্টিওপোরোসিস এবং ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশের অস্টিওপেনিয়া শনাক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ, গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৩ শতাংশের বেশি নারীর হাড়ের ঘনত্বে ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে ৪৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সি নারীদের ওপর পরিচালিত একটি পুরোনো হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় অস্টিওপোরোসিসের হার ছিল ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অস্টিওপেনিয়ার হার ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ।

তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর নারীরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশে কতসংখ্যক নারী অস্টিওপোরোসিসে ভুগছেন, তার নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়। এ জন্য আরও গবেষণা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং রোগ নির্ণয়ের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

ডা. জুবাইদা রহমানের মতে, অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে শৈশব থেকেই সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। বিশেষ করে কন্যাশিশু ও তরুণীদের জন্য যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এ রোগ এবং এর জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

রোগটি মোকাবিলায় কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমত, একটি অস্টিওপোরোসিস সোসাইটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ সংগঠনের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলায় সমন্বিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। কোনো এলাকার মানুষ যেন সচেতনতা ও স্ক্রিনিংয়ের অভাবে এ রোগের ব্যথা ও দুর্ভোগের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী কর্মরত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিবছর অস্টিওপোরোসিস সচেতনতা মাস পালনের প্রস্তাব দেন তিনি। এ উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা, প্রচারাভিযানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের পাশাপাশি জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের জন্য আধুনিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতি নিয়ে সেমিনার আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

হাড়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, হাড়ের খনিজ ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং শৈশবে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসা-অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

তিনি হাড়ের খনিজ ঘনত্ব নির্ণয়ে স্ক্রিনিং ক্যাম্প আয়োজন এবং নিয়মিত বিরতিতে কমিউনিটিভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। যেসব এলাকায় হাড়ের খনিজ ঘনত্ব পরিমাপের সুযোগ নেই, সেখানে ফ্র্যাকচার রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টুল ব্যবহার করে হাড় ভাঙার ঝুঁকি মূল্যায়নের পরামর্শ দেন তিনি।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, অস্টিওপোরোসিসের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে হলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সবার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার, চিকিৎসক সমাজ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং ডা. আব্দুস সালাম এমপি।

সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর পর্ব, প্যানেল আলোচনা ও কুইজ অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী, অধ্যাপক ডা. ফারুক কাশেম, অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ, ডা. শেখ ফরিদ আহমেদ এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলালুল ইসলাম।

উল্লেখ্য, ‘আজীবন হাড় গড়ুন, সুরক্ষা দিন ও শক্তিশালী করুন’ প্রতিপাদ্যে এবারের বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা দিচ্ছে ইনসেপ্টা।

হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ অস্টিওপোরোসিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২০ অক্টোবর বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস পালন করা হয়। এ রোগে হাড়ের শক্তি ও ঘনত্ব কমে যাওয়ায় হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

সর্বশেষ