মোঃ রাকিব: জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা লুটপাট, চাঁদাবাজি কিংবা অন্যায়-অবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, মানুষের অধিকার হরণ, জুলুম এবং অন্যের সম্পদ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত কাউকেই জবাবদিহির বাইরে রাখা যাবে না। প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতে হবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর উদ্যোগে আয়োজিত ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের প্রাক্তন সাথী-সদস্য সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ কোনোভাবেই লুটতরাজ, চাঁদাবাজি ও অন্যায়-অবিচার মেনে নেবে না। মানুষের ওপর জুলুম করা, তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া কিংবা অন্যের প্রাপ্য আত্মসাৎ করার পরিণতি ভোগ করতে হবে। অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ কারও নেই।
ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব ও নৈতিকতার বিষয়ে জামায়াত আমীর বলেন, এ আন্দোলনের দায়িত্ব আমৃত্যু পালন করতে হবে। গত ১৭ বছরে তাঁদের ওপর বিভিন্ন ধরনের জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের ১২ জন নেতাকে শতাব্দীর নিকৃষ্ট অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নেতা আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস রেখে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তিনি বলেন, মানুষের আমানত রক্ষা করার বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি জনগণের যে আস্থা তৈরি হয়েছে, তা এক দিনে গড়ে ওঠেনি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অসংখ্য নারী-পুরুষকে জীবন দিতে হয়েছে, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এসব ত্যাগের মূল্যায়ন করতে হলে ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে।
অতীতের ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অন্যায় করে কেউ শেষ পর্যন্ত রেহাই পাবে না। মানুষের ওপর জুলুম করা কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করার পরিণতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক এক বিচারপতির সীমান্ত এলাকায় আটক হওয়ার ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন।
প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন করতে হবে এবং সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেওয়া কিছু বক্তব্যকে ভিত্তিহীন ও অবান্তর উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব কথার জবাব দেওয়ার পেছনে সময় ব্যয় না করে আদর্শ, নৈতিকতা ও কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের এ সম্মেলন তাঁকে অভিভূত করেছে। ইসলামী আন্দোলন ব্যক্তিগত লাভ বা দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য নয়; বরং আদর্শিক বিশ্বাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। দেশ ও জাতির কল্যাণে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, প্রাক্তন সাথী-সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তাঁদের মধ্যে আদর্শিক চেতনা এখনও সক্রিয় থাকার প্রমাণ। এ সম্মেলন শুধু পুনর্মিলনের আয়োজন নয়, বরং দেশের প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালনের প্রত্যয়। অতীতের শিক্ষা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দেশের মানুষ আদর্শিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে। ন্যায়বিচার, সততা ও জনকল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমীর ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ছাত্রজীবনে সংগঠন থেকে অর্জিত নীতি-নৈতিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি সারা জীবন কাজে লাগাতে হবে। মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসার পাশাপাশি সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বিভক্তি তৈরি না করে বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে ঐক্য ও সহনশীলতা বজায় রাখা জরুরি। তাঁর মতে, জামায়াত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও রাহাজানি বন্ধ করা সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় নেতারা, সাবেক ছাত্রনেতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সাংগঠনিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
বক্তারা ইসলামী মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সততা, সাংগঠনিক ঐক্য ও জনকল্যাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী, সাবেক চাকসু ভিপি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদসহ চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতারা।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিনসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতারা।

